📅 বুধবার, 21 অক্টোবর, 2026 ময়মনসিংহের তথ্যকোষ
হোটেল/রেস্তোরা

মুক্তাগাছার মণ্ডা: 200 বছরের ইতিহাস, দাম ও আসল মণ্ডা কেনার গাইড

ময়মনসিংহের নাম উঠলেই যে খাবারটির কথা সবার আগে মনে আসে, তা হলো মুক্তাগাছার মণ্ডা। দুইশ বছরের বেশি সময় ধরে এই একটি মিষ্টি শুধু ময়মনসিংহে নয়, সারা দেশের মিষ্টিপ্রেমীদের কাছে সমান জনপ্রিয়। 2024 সালে মণ্ডা পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের সরকারি স্বীকৃতিও। কিন্তু আসল মণ্ডা পাওয়া যায় মাত্র একটি দোকানেই, মুক্তাগাছায়।

মণ্ডার ইতিহাস

মণ্ডার যাত্রা শুরু 1824 সালে (1231 বঙ্গাব্দ)। কথিত আছে, মিষ্টি তৈরির এই বিশেষ প্রণালী রাম গোপাল পাল পেয়েছিলেন স্বপ্নে। মিষ্টি বানিয়ে তিনি তা পরিবেশন করেন মুক্তাগাছার প্রভাবশালী জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর সামনে। স্বাদে মুগ্ধ হয়ে মহারাজা গোপাল পালকে উৎসাহ তো দিলেনই, ব্যবসা সম্প্রসারণে আর্থিক সহায়তাও করেন। এরপর থেকে জমিদার বাড়িতে আসা অতিথিদের আপ্যায়নের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে মণ্ডা।

জমিদার বাড়ির অতিথি তালিকায় ছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ডা. বিধানচন্দ্র রায় ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো ব্যক্তিত্ব, সবাই স্বাদ নিয়েছেন এই মণ্ডার। পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার জোসেফ স্তালিন মণ্ডার প্রশংসা করেছেন, পাকিস্তানের আইয়ুব খান একে ডাকতেন "পূর্ব পাকিস্তানকা মেওয়া" বলে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তো মণ্ডা নিয়ে গিয়েছিলেন চীনের মাও সে তুং-এর জন্য, তিনিও স্বাদের প্রশংসা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ইন্দিরা গান্ধী ও রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকেও আপ্যায়ন করা হয়েছে মুক্তাগাছার মণ্ডা দিয়ে।

বিজ্ঞাপন

দুইশ বছর পেরিয়ে গেলেও দোকানটি এখনও চালাচ্ছেন গোপাল পালেরই বংশধররা, বর্তমানে পঞ্চম প্রজন্মের রামেন্দ্রনাথ পাল ও তাঁর ভাইয়েরা। আর মণ্ডা তৈরির আসল প্রণালী আজও পরিবারের বাইরে কারও কাছে প্রকাশ করা হয়নি, এই গোপনীয়তাই মণ্ডার স্বাদকে দুইশ বছর ধরে একই রকম রেখেছে বলে মনে করেন অনেকে।

জিআই স্বীকৃতি ও আজকের মণ্ডা

2024 সালের 12 ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার মুক্তাগাছার মণ্ডাকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ এখন থেকে আইনগতভাবেও এই নাম ও ঐতিহ্য মুক্তাগাছার নিজস্ব সম্পদ। এলাকার দুধ উৎপাদনকারী খামারি থেকে শুরু করে মিষ্টি তৈরির কারিগর পর্যন্ত অনেকের জীবিকা জড়িয়ে আছে এই একটি মিষ্টির সঙ্গে। শুধু মুক্তাগাছা নয়, পার্শ্ববর্তী শেরপুরেও মণ্ডা তৈরি হয়, তবে উৎপত্তি আর আসল স্বাদের ঠিকানা হিসেবে মুক্তাগাছার নামটাই সবাই এক বাক্যে মেনে নেয়। প্রতিদিন দেশের নানা জেলা থেকে মানুষ শুধু মণ্ডা কিনতেই মুক্তাগাছায় আসেন, আবার অনেকে আত্মীয়-স্বজনের জন্য কেজি কেজি মণ্ডা নিয়ে যান।

মণ্ডা খেতে কেমন, কী দিয়ে তৈরি

মণ্ডা মূলত ছানা-ভিত্তিক মিষ্টি, অনেকটা সন্দেশের ঘরানার। প্রধান উপকরণ দুধ থেকে তৈরি ছানা আর চিনি। এছাড়া গুড় দিয়ে তৈরি "গুড়ের মণ্ডা" নামে আরেকটি ধরনও পাওয়া যায়। আকারে ছোট, গোলচে ও সামান্য চ্যাপ্টা। মুখে দিলে নরম ছানার মোলায়েম ভাব ধীরে ধীরে গলে যায়; মিষ্টি হলেও স্বাদ ভারী নয়, খাওয়ার পর ক্লান্তিও লাগে না। এই এক দোকান থেকেই প্রতিদিন বিক্রি হয় প্রায় 250 থেকে 300 কেজি মণ্ডা, আর পার্সেলে চলে যায় দেশের নানা প্রান্তে এমনকি বিদেশেও।

আসল মণ্ডা কোথায় পাবেন

"মুক্তাগাছার মণ্ডা" নামে মিষ্টি এখন অনেক জায়গাতেই বিক্রি হয়, কিন্তু খাঁটি মণ্ডা পাওয়া যায় শুধু মুক্তাগাছায় গোপাল পালের আদি দোকানেই, এই দোকানের কোনো দ্বিতীয় শাখা নেই। দোকানটি মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির (রাজবাড়ি) ঠিক সামনে অবস্থিত; জমিদার বাড়ি ঘুরতে গেলে দোকানটি চোখে পড়বেই। তাই আসল স্বাদ পেতে হলে সরাসরি মুক্তাগাছায় গিয়ে এই দোকান থেকেই মণ্ডা কিনুন।

মণ্ডার দাম

বর্তমানে আসল মণ্ডার দাম প্রতি কেজি প্রায় 600 টাকা। তবে দুধ ও চিনির বাজারদরের উপর নির্ভর করে এই দাম সময়ে সময়ে কমবেশি হয়, 2020 সালের দিকে কেজি প্রতি দাম ছিল 440 টাকার আশেপাশে। দোকানে পিস হিসেবেও মণ্ডা কেনা যায়, আর বাড়ির জন্য নিতে চাইলে কেজি দরে প্যাকেট করে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

ময়মনসিংহ শহর থেকে মুক্তাগাছা যাওয়ার উপায়

ময়মনসিংহ শহর থেকে মুক্তাগাছার দূরত্ব মাত্র প্রায় 17 কিলোমিটার। শহরের টাউন হল মোড়ের সামনে থেকে মুক্তাগাছাগামী লোকাল বাস পাওয়া যায়; চাইলে সিএনজি রিজার্ভ করেও যাওয়া যায়। সড়কপথে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় 40 থেকে 50 মিনিট। মুক্তাগাছায় নেমে রিকশায় চড়ে কিংবা সামান্য হেঁটেই পৌঁছে যাবেন জমিদার বাড়ি, তার সামনেই মণ্ডার দোকান। ফেরার পথেও একইভাবে লোকাল বাস, লেগুনা বা সিএনজি পেয়ে যাবেন।

কেনার আগে কয়েকটি টিপস

  • আসল মণ্ডার জন্য জমিদার বাড়ির সামনের গোপাল পালের দোকান থেকেই কিনুন, অন্য কোথাও এই দোকানের শাখা নেই।
  • একই ভ্রমণে মুক্তাগাছা জমিদার বাড়িটাও ঘুরে দেখুন; মণ্ডার দোকান ঠিক তার গেটের সামনেই।
  • মণ্ডা তাজা অবস্থায় খেতেই সবচেয়ে ভালো লাগে, দোকানে গেলে প্রথমে দু-এক পিস খেয়ে স্বাদ যাচাই করে তারপর কেজি দরে কিনুন।
  • দূরে থাকা আত্মীয়-স্বজনের জন্য পাঠাতে চাইলে দোকান থেকে পার্সেলের সুবিধা পাওয়া যায় কিনা জেনে নিন, দোকান থেকে দেশ-বিদেশে পার্সেল পাঠানো হয়।
  • দুধ ও চিনির দামের উপর মণ্ডার দাম ওঠানামা করে, তাই কেনার সময় দোকানে দামটা যাচাই করে নিন।

ময়মনসিংহ ঘুরতে এসে মুক্তাগাছার মণ্ডা না খেয়ে ফিরলে ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সময় পেলে একবার মুক্তাগাছায় গিয়ে দুইশ বছরের পুরনো সেই স্বাদটা নিজেই খেয়ে দেখুন।

W

সাইট এডিটর

Walid Forhad

mymensingh.info-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এডিটর। সাইটের লেখা সম্পাদনা আর প্রকাশনার দিকটা তিনিই দেখেন।