📅 বুধবার, 4 নভেম্বর, 2026 ময়মনসিংহের তথ্যকোষ
দর্শনীয় স্থান

ময়মনসিংহের জয়নুল আবেদিন পার্ক: ব্রহ্মপুত্র তীরে ঘোরার গাইড, যেভাবে যাবেন ও খরচ

ময়মনসিংহ শহরে বিকেল কাটানোর সবচেয়ে পরিচিত জায়গা কোনটা, জিজ্ঞেস করলে বেশিরভাগ মানুষ এক নামই বলবে: জয়নুল আবেদিন পার্ক। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে, সার্কিট হাউজের পাশে এই পার্ক শহরের মানুষের কাছে "জয়নুল উদ্যান" নামেও পরিচিত। নাম রাখা হয়েছে ময়মনসিংহে জন্ম নেওয়া বিখ্যাত চিত্রশিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামে, যিনি ছোটবেলায় এই নদের তীরে বসে ছবি আঁকতেন বলে জানা যায়। শহরের একমাত্র বড় খোলা বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিদিন বিকেলে এখানে সব বয়সের মানুষের ভিড় জমে।

যাঁর নামে পার্ক

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন 1914 সালে ময়মনসিংহে জন্ম নেন। 1943 সালের দুর্ভিক্ষের ওপর আঁকা তাঁর ছবিগুলো তাঁকে দেশজোড়া পরিচিতি এনে দেয়, আর পরে তিনি ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলেন। তাঁর শৈশব আর কৈশোর কেটেছে এই ব্রহ্মপুত্র নদের তীরেই, তাই তাঁর নামে পার্ক আর সংগ্রহশালা দুটোই গড়ে উঠেছে এই নদের পাড়ে। পার্কে ঘুরতে গিয়ে এই ইতিহাসটা জানা থাকলে জায়গাটা আরও আপন মনে হয়।

কোথায়, কীভাবে যাবেন

পার্কটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে, সার্কিট হাউজ সংলগ্ন পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে। শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে একদম কাছেই, তাই শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় সহজে যাওয়া যায়। শহরের ভেতর থেকে রিকশা ভাড়া দূরত্ব অনুযায়ী আনুমানিক 10 থেকে 50 টাকার মধ্যে পড়ে। ময়মনসিংহ ব্রিজের দিক থেকে আসতে রিকশায় প্রায় 30 মিনিট লাগে। মাসকান্দা বাস টার্মিনাল বা রেলস্টেশন থেকে অটোরিকশায় সরাসরি পার্কের গেটে নামা যায়।

বিজ্ঞাপন

পার্কের ভেতরে কী কী আছে

নদীর পাড় ঘেঁষে বাঁধের ওপর গড়ে তোলা পার্কটায় সবুজের মাঝে হাঁটার জায়গা আছে, আর নদের দিকে মুখ করে বসার বেঞ্চ। বাচ্চাদের জন্য আছে দোলনা, ছোট ট্রেন, ম্যাজিক নৌকা আর চরকির মতো রাইড; ঘোড়ার গাড়িতেও চড়া যায়। পার্কের এক পাশে মিনি চিড়িয়াখানা, আছে বৈশাখী মঞ্চ, যেখানে উৎসবের সময় অনুষ্ঠান হয়। নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে নৌকা চলাচল দেখা যায়, আর খিদে পেলে ভেতরে ও গেটের বাইরে খাবারের দোকান পাবেন। বিকেলের দিকে নদীর হাওয়া আর ডুবন্ত সূর্যের দৃশ্য দেখতে এখানে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে নদের ওপারে আকাশের রং বদলাতে দেখা পার্কের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি।

পাশেই জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা

পার্কের লাগোয়া এলাকাতেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, সাহেব কোয়ার্টারের দিকে। তাঁর জন্মস্থান ময়মনসিংহে গড়ে তোলা এই সংগ্রহশালা এখন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে পরিচালিত। ভেতরে তাঁর আঁকা বিখ্যাত ছবি আর ব্যবহার্য জিনিসপত্র রাখা আছে। পার্কে গেলে সংগ্রহশালাটাও একসাথে ঘুরে আসা যায়; সংগ্রহশালা নিয়ে বিস্তারিত আছে এই পোস্টে।

পার্কের আশপাশে আরও যা দেখবেন

পার্ক থেকে হাঁটা দূরত্বেই সার্কিট হাউজ মাঠ। একটু এগোলেই আলেকজান্ডার ক্যাসেল, আর শহরের দিকে শশীলজ। সময় থাকলে ময়মনসিংহ জাদুঘর বা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসটাও ঘুরে আসা যায়। ফলে এক বিকেলে পার্ককেন্দ্রিক ছোট একটা ট্যুর সাজিয়ে ফেলা যায়, আলাদা করে গাড়ি ভাড়া না করেই।

ঘোরার সেরা সময়

পার্ক ঘোরার সবচেয়ে ভালো সময় বিকেল থেকে সন্ধ্যা। এই সময় নদীর পাড়ে হাওয়া থাকে, আর সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে অনেকেই আসেন। শীতকালে দিনের বেলাতেও আরামে ঘোরা যায়; বর্ষায় নদী পানিতে ভরে উঠলে পাড়ের দৃশ্য আরও সুন্দর হয়, তবে ঘাটের দিকে নামার সময় সাবধান থাকা ভালো। সকালের দিকে পার্ক তুলনামূলক ফাঁকা থাকে, যারা নিরিবিলি হাঁটতে বা বসে থাকতে চান তাদের জন্য সেটাই ভালো সময়। ছুটির দিনে ভিড় বেশি হয়, তাই ফাঁকা পরিবেশ চাইলে কর্মদিবসে যাওয়াই ভালো।

ঢাকা থেকে দিনের ট্রিপ

ঢাকা থেকে সকালে ট্রেন বা বাসে রওনা দিলে দুপুরের আগেই ময়মনসিংহ পৌঁছানো যায়। স্টেশন বা মাসকান্দা থেকে সরাসরি পার্কে চলে আসুন, দুপুরে শহরে খাওয়া সেরে বিকেলটা পার্ক আর সংগ্রহশালায় কাটান। সন্ধ্যার দিকে ফেরার বাস-ট্রেনও পাওয়া যায়, তাই দিনে দিনে ঘুরে ফেরা সম্ভব। ময়মনসিংহের বিখ্যাত মণ্ডা খেতে চাইলে ফেরার পথে মুক্তাগাছার দিকেও ঢুঁ মারা যায়, যদিও সেটা আলাদা ট্রিপ হিসেবে করাই ভালো।

যা মাথায় রাখবেন

বাচ্চাদের নিয়ে গেলে রাইড আর নদীর ঘাটের দিকে খেয়াল রাখুন। নদের পাড়ের ঘাটে নামার সময় পা পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই সাবধানে নামুন। খাবার বা রাইডের দাম জায়গা ভেদে আলাদা হতে পারে, আগে জেনে নিলে ভালো। গরমের দিনে পানির বোতল সাথে রাখুন, কারণ পার্কের ভেতরে ঘোরাঘুরিতে সময় কেটে যায় টেরই পাওয়া যায় না। সন্ধ্যার পর পার্কের একদম নির্জন দিকগুলো এড়িয়ে চলুন, আর মূল্যবান জিনিসপত্র সাবধানে রাখুন।

W

লেখক

Walid Forhad

Mymensingh Info-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এডিটর।