📅 শুক্রবার, 6 নভেম্বর, 2026 শেরপুরের তথ্যকোষ

গজনী অবকাশ কেন্দ্র শেরপুর: গারো পাহাড়ের পাদদেশে দিনের ট্রিপের পুরো গাইড

শেরপুর শহর থেকে প্রায় 30 কিলোমিটার উত্তরে, ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নে গারো পাহাড়ের পাদদেশে সবুজে ঘেরা একটা জায়গা, গজনী অবকাশ কেন্দ্র। উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা পাহাড়, চারপাশে শাল গজারি আর সেগুনের বন, মাঝখানে কৃত্রিম লেক। 1993 সালে শেরপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় 90 একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে জায়গাটা গড়ে তোলা হয়, তারপর থেকে এটা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত পিকনিক আর দিনের ট্রিপের ঠিকানাগুলোর একটা। শীতের মৌসুমে দেশের নানা প্রান্ত থেকে দল বেঁধে মানুষ এখানে আসে।

কেন্দ্রের ভেতরে যা যা আছে

গজনীর সবচেয়ে পরিচিত জায়গা পাহাড়ি ঝরনার গতিপথে বাঁধ দিয়ে বানানো কৃত্রিম লেক। লেকের মাঝখানে কৃত্রিম পাহাড়ের ওপর লেক ভিউ পেন্টাগন, সেখানে যাওয়া যায় দোদুল্যমান সেতু ধরে। লেকে প্যাডেল বোট আর দেশি নৌকায় ঘোরা যায়, লেকের স্বচ্ছ পানিতে পাহাড় আর গাছপালার প্রতিবিম্ব পড়ে। লেকের ধারে কৃত্রিম জলপ্রপাত আর পদ্মসিঁড়ি আছে।

পাহাড়ের চূড়ায় বানানো সাইট ভিউ ওয়াচ টাওয়ার থেকে চারপাশের সবুজ টিলা, বনভূমি আর সীমান্তের ওপারে মেঘালয়ের উঁচু নিচু পাহাড় একসাথে দেখা যায়। পরিষ্কার দিনে উত্তর দিকে তাকালে তুরা পাহাড়ও চোখে পড়ে, আর ভাগ্য ভালো থাকলে সীমান্তের বন্য হাতির দলও দেখা যায়। পাহাড়ের চূড়ায় 6 কক্ষবিশিষ্ট আধুনিক রেস্টহাউস আছে, সেখান থেকে পাহাড়ের পাদদেশে নামার জন্য আঁকাবাঁকা পদ্মসিঁড়ি বানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পরিবার নিয়ে পিকনিকের জন্য আলাদা জায়গা, বট চত্বর আর গাড়ি রাখার বড় ব্যবস্থা আছে। শিশুদের জন্য মিনি চিড়িয়াখানা আর খেলার জায়গা আছে। পাহাড়ের আশপাশে গারোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে, তাদের গ্রাম আর জীবনযাত্রাও এই এলাকার একটা আলাদা দিক।

কখন যাবেন

গজনী যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময় আবহাওয়া ঠান্ডা আর শুকনো থাকে, পাহাড়ে হাঁটতে আর টাওয়ারে উঠতে আরাম লাগে, লেকের পানিও পরিষ্কার থাকে। শীতের মৌসুমেই এখানে সবচেয়ে বেশি মানুষ আসে, পিকনিকের দলগুলোও এই সময়েই ভিড় করে। বর্ষায় পাহাড় আরও সবুজ হয়, কিন্তু পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়, তাই বর্ষায় গেলে সাবধানে হাঁটতে হয়। সকালে গিয়ে বিকেলের মধ্যে ঘুরে আসা যায়, একদিনেই পুরো কেন্দ্র দেখা হয়ে যায়।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে শেরপুর শহরে আসতে হয়, দূরত্ব প্রায় 200 কিলোমিটার, সময় লাগে প্রায় 5 ঘণ্টা। ময়মনসিংহ হয়েও যাওয়া যায়। শেরপুর শহরের নিউমার্কেট থেকে গজনী যাওয়ার জন্য রিজার্ভ মাইক্রোবাস বা সিএনজি পাওয়া যায়। লোকাল বাসে ঝিনাইগাতী উপজেলা সদরে নেমে সেখান থেকে বাস, টেম্পু, সিএনজি বা রিকশায় গজনী যাওয়া যায়, ঝিনাইগাতী থেকে গজনীর দূরত্ব প্রায় 8 কিলোমিটার। গজনী যাওয়ার পথে রাংটিয়া নামক স্থানে কেন্দ্রের একটা পূর্ণাঙ্গ ম্যাপ দেখা যায়, সেখান থেকে ভেতরের জায়গাগুলোর অবস্থান বুঝে নেওয়া যায়।

খরচের হিসাব

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী গজনী অবকাশ কেন্দ্রে প্রবেশ ফি জনপ্রতি 20 টাকা, ওয়াচ টাওয়ারের টিকিটও জনপ্রতি 20 টাকা। ভাসমান সেতু ও লেক ভ্রমণের জন্য 200 টাকা লাগে। গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকতে হলে উপজেলা পরিষদ চেকপোস্ট থেকে গেটপাস নিতে হয়, বাস ও ট্রাকের জন্য 300 টাকা, মাইক্রোবাস ও পিকআপের জন্য 150 টাকা, প্রাইভেট কার ও জিপের জন্য 100 টাকা আর সিএনজির জন্য 50 টাকা। এসব ফি সময়ভেদে বদলাতে পারে, তাই যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়া ভালো।

একদিনের ট্রিপের পরিকল্পনা

সকালে রওনা দিয়ে দুপুরের আগেই গজনী পৌঁছানো ভালো, তাহলে হাতে অনেক সময় থাকে। প্রথমে ওয়াচ টাওয়ারে উঠে পুরো এলাকাটা দেখে নেওয়া যায়, তারপর লেকের ধারে ঘুরে নৌকায় চড়া যায়। দুপুরে পিকনিকের জায়গায় বসে নিজেদের খাবার খাওয়া যায়, অথবা আশপাশের দোকানে খাওয়া যায়। বিকেলে পদ্মসিঁড়ি ধরে পাহাড়ের চূড়ার রেস্টহাউসের দিকে হেঁটে যাওয়া যায়, পথে জলপ্রপাত আর বনের দৃশ্য দেখা যায়।

বিজ্ঞাপন

গজনীর কাছেই নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্ক। হাতে সময় থাকলে একই দিনে দুটো জায়গাই ঘুরে আসা যায়, দুটোই গারো পাহাড়ের পাদদেশে। পাহাড়ি পথে হাঁটার জন্য আরামদায়ক জুতা পরা ভালো, আর সাথে পানি রাখা দরকার। কেন্দ্রের ভেতরে খাবারের দোকান কম, তাই বাচ্চাদের সাথে গেলে হালকা খাবার সাথে নেওয়া ভালো।

জায়গাটা যেভাবে গড়ে উঠল

গজনীর আদি নাম ছিল গাজনী, দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে নামটা গজনী হয়েছে। গারো পাহাড়ের এই অংশে একসময় শুধু বন আর পাহাড়ি ঝরনা ছিল। 1993 সালে শেরপুর জেলা প্রশাসন এখানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ নেয়, পাহাড়ি ঝরনার পানিতে বাঁধ দিয়ে লেক বানানো হয়, টাওয়ার আর রেস্টহাউস তৈরি হয়। ধীরে ধীরে জায়গাটা শেরপুরের সবচেয়ে পরিচিত বিনোদন কেন্দ্র হয়ে ওঠে। সীমান্তের কাছে হওয়ায় এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আছে, আর পাহাড়ি এলাকায় ঘোরার সময় সীমান্তের দিকে বেশি দূর না যাওয়াই ভালো।

W

লেখক

Walid Forhad

Mymensingh Info-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এডিটর।