মধুটিলা ইকোপার্ক শেরপুর: গারো পাহাড়ের পাদদেশে দিনের ট্রিপের পুরো গাইড

শেরপুর শহর থেকে প্রায় 30 কিলোমিটার উত্তরে, নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নে গারো পাহাড়ের পাদদেশে সবুজে ঢাকা একটা জায়গা, মধুটিলা ইকোপার্ক। প্রায় 380 একর বনভূমি জুড়ে ছড়িয়ে আছে উঁচু নিচু টিলা, শাল গজারির বন, কৃত্রিম লেক আর হাঁটার পথ। বাংলাদেশ ভারত সীমান্তের একদম কাছে এই পার্ক, ওপারে মেঘালয়ের তুরা পাহাড় মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে। 1999 সালে জায়গাটাকে ইকোপার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়, আর 2004 সালে প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয়। শেরপুরে একদিনের ঘোরাঘুরির জন্য এটাই সবচেয়ে জনপ্রিয় ঠিকানা।
পার্কের ভেতরে যা যা আছে
পার্কের সবচেয়ে পরিচিত জায়গা পাহাড়ের চূড়ায় বানানো ওয়াচ টাওয়ার। টাওয়ারটা 100 ফুটেরও বেশি উঁচু, ওপরে উঠলে চারপাশের সবুজ টিলা আর দূরে মেঘালয়ের পাহাড় একসাথে চোখে পড়ে। পরিষ্কার দিনে সীমান্তের ওপারের দৃশ্যও দেখা যায়। পার্কের মাঝখানে আছে কৃত্রিম লেক, লেকের ওপর স্টার ব্রিজ নামে একটা সুন্দর সেতু। লেকে প্যাডেল বোট আর দেশি নৌকায় ঘোরা যায়। লেকের ধারে আর পথের পাশে হাতি, বাঘ, হরিণ, সিংহ, ক্যাঙ্গারু, কুমির, প্যাঁচা আর মৎস্যকন্যার ভাস্কর্য বসানো আছে, বাচ্চাদের এগুলো খুব পছন্দ হয়।
পার্কের ভেতরে ছোট একটা মিনি চিড়িয়াখানা আছে, শিশুদের জন্য রাইড আর খেলার জায়গাও আছে। পাহাড়ের চূড়ায় মহুয়া রেস্ট হাউজ, দিনের বেলায় বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করা যায়। পার্কজুড়ে প্রায় 20 একর জায়গায় ঔষধি গাছের বাগান আছে, আর আছে দুর্লভ প্রজাতির গাছের বাগান। পরিবার নিয়ে পিকনিকের জন্য আলাদা জায়গা, ক্যান্টিন আর গাড়ি রাখার ব্যবস্থাও আছে।
কখন যাবেন
মধুটিলা যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় নভেম্বর থেকে মার্চ। এই সময় আবহাওয়া ঠান্ডা আর শুকনো থাকে, পাহাড়ে হাঁটতে আর টাওয়ারে উঠতে আরাম লাগে। বর্ষায় পার্ক আরও সবুজ হয়, কিন্তু পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়, তাই বর্ষায় গেলে সাবধানে হাঁটতে হয়। সকালে গিয়ে বিকেলের মধ্যে ঘুরে আসা যায়, একদিনেই পুরো পার্ক দেখা হয়ে যায়।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে শেরপুর শহরে আসতে হয়, দূরত্ব প্রায় 200 কিলোমিটার। শেরপুর শহরের শাপলা চত্বর থেকে মধুটিলা আর গজনী যাওয়ার জন্য রিজার্ভ সিএনজি পাওয়া যায়। শেরপুর থেকে মধুটিলা প্রায় 30 কিলোমিটার, যেতে সময় লাগে এক ঘণ্টার মতো। নালিতাবাড়ী উপজেলা শহর হয়েও যাওয়া যায়, সেখান থেকে পার্কের দূরত্ব কম। যারা ময়মনসিংহ থেকে আসবেন, তারা শেরপুরের বাস ধরে শহরে নেমে সেখান থেকে সিএনজি নিতে পারেন।
একদিনের ট্রিপের পরিকল্পনা
সকালে রওনা দিয়ে দুপুরের আগেই পার্কে পৌঁছানো ভালো, তাহলে হাতে অনেক সময় থাকে। প্রথমে ওয়াচ টাওয়ারে উঠে পুরো এলাকাটা দেখে নেওয়া যায়, তারপর লেকের ধারে ঘুরে নৌকায় চড়া যায়। দুপুরে ক্যান্টিনে খাওয়া যায়, অথবা নিজেরা খাবার নিয়ে পিকনিকের জায়গায় বসা যায়। বিকেলে পাহাড়ি পথে হেঁটে ভাস্কর্য আর ঔষধি বাগান দেখে ফেরার পথ ধরা যায়।
মধুটিলার কাছেই ঝিনাইগাতীর গজনী অবকাশ কেন্দ্র। হাতে সময় থাকলে একই দিনে দুটো জায়গাই ঘুরে আসা যায়, দুটোই গারো পাহাড়ের পাদদেশে। পাহাড়ি পথে হাঁটার জন্য আরামদায়ক জুতা পরা ভালো, আর সাথে পানি রাখা দরকার। পার্কের ভেতরে খাবারের দোকান কম, তাই বাচ্চাদের সাথে গেলে হালকা খাবার সাথে নেওয়া ভালো।
পার্কটা যেভাবে গড়ে উঠল
মধুটিলা বনাঞ্চল আগে শুধুই বন বিভাগের একটা রেঞ্জ ছিল। 1999 সালে সরকার এই বনকে ইকোপার্ক হিসেবে ঘোষণা দেয়। প্রথম ধাপের কাজ শেষ হয় 2004 সালের জুনে, তখন খরচ হয়েছিল প্রায় 1 কোটি 64 লাখ টাকা। ওই ধাপে লেক খোঁড়া হয়, পাহাড়ের চূড়ায় ওয়াচ টাওয়ার বানানো হয়, আর লেকের ধারে হাতি, বাঘ, হরিণ, কুমির, সাপ আর মৎস্যকন্যার ভাস্কর্য বসানো হয়। পরের ধাপে মিনি চিড়িয়াখানা, শিশুদের খেলার জায়গা, পিকনিকের জায়গা, তথ্যকেন্দ্র আর গাড়ি রাখার জায়গা যোগ হয়। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে পর্যটকদের জন্য গড়ে ওঠা প্রথম কৃত্রিম পার্ক এটাই। এখন পার্কটা ময়মনসিংহ বন বিভাগের অধীনে, মধুটিলা রেঞ্জের সমেশ্চূড়া আর পোড়াগাঁও বিট মিলিয়ে মোট 380 একর জায়গা নিয়ে এর সীমানা।
বন আর পাহাড়ের পরিবেশ
পার্কের চারপাশে শাল, গজারি, সেগুন আর মেহগনির বন। টিলার ওপর থেকে নিচে তাকালে সবুজের ঢেউ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। বর্ষায় এই সবুজ আরও গাঢ় হয়, শীতে হালকা কুয়াশায় পাহাড়ের মাথা ঢেকে যায়। পার্কের ভেতরে হাঁটার পথ ধরে এগোলে পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ তেমন কানে আসে না। গারো পাহাড়ের এই অংশে গারো আর হাজং সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস, আশপাশের গ্রামে তাদের জীবনযাত্রার ছোঁয়া দেখা যায়। পার্কে ঘুরতে গিয়ে প্লাস্টিক বা খাবারের প্যাকেট ফেলে না আসাই ভালো, বনটা পরিষ্কার থাকলে পরের দর্শনার্থীরাও একই সৌন্দর্য পাবে।



