📅 বুধবার, 4 নভেম্বর, 2026 নেত্রকোণার তথ্যকোষ
দর্শনীয় স্থান

বিরিশিরি ভ্রমণ গাইড: চীনামাটির পাহাড়, সোমেশ্বরী নদী ও যাতায়াত খরচ

মেঘালয়ের পাহাড় ঘেঁষে নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলায় বিরিশিরি। ঢাকা থেকে প্রায় 170-180 কিলোমিটার উত্তরে এই জায়গাটার নাম এখন ভ্রমণপিপাসুদের মুখে মুখে। সাদা, লাল আর হলুদ মাটির পাহাড়, তার গায়ে নীলচে-সবুজ পানির জলাশয় আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সোমেশ্বরী নদী, এই তিন মিলেই বিরিশিরির আসল রূপ। একদিন বা দুদিনের ট্রিপে ঘুরে আসা যায়, শুধু আগে থেকে একটা পরিকল্পনা থাকলেই হলো। পরিবার নিয়ে বা বন্ধুদের দল বেঁধে যাওয়ার জন্য জায়গাটা উপযুক্ত, কারণ বেশিরভাগ স্পট একে অন্যের কাছাকাছি।

কী কী দেখবেন

চীনামাটির পাহাড় ও নীল জলাশয়

বিরিশিরির সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড়। খনি থেকে মাটি তোলার পর গর্তগুলোয় জমে থাকা পানি নীলচে-সবুজ রঙ ধারণ করেছে, আর পাহাড়ের গায়ে সাদা, লাল, হলুদ মাটির স্তর। ছবিতে যেমন দেখা যায়, বাস্তবেও তেমনই লাগে। এই স্পটে যেতে সোমেশ্বরী নদী পার হতে হয়। নদীর ওপারে ব্যাটারিচালিত অটো বা বাইকে পাহাড় আর জলাশয় ঘোরা যায়।

সোমেশ্বরী নদী

দুর্গাপুর আর বিরিশিরিকে আলাদা করেছে সোমেশ্বরী। বালুময় চর, স্বচ্ছ পানি আর দূরে মেঘালয়ের পাহাড়ের সারি মিলিয়ে নদীর পাড়টা বিকেলে হাঁটার মতো জায়গা। চাইলে নৌকায় ঘোরা যায়।

বিজ্ঞাপন

বিজয়পুর সীমান্ত, রানীখং গির্জা ও কমলার বাগান

চীনামাটির পাহাড় থেকে একটু এগুলেই বিজয়পুর সীমান্ত। জিরো পয়েন্টের কাছে বিজিবি ক্যাম্প, পাশে কমলার বাগানের টিলা। শীতের মৌসুমে গাছে কমলা ধরে থাকলে দৃশ্যটা সুন্দর লাগে। একই এলাকায় রানীখং গির্জা, পুরনো এই মিশন চার্চটা দেখার মতো। সীমান্ত এলাকা বলে এখানে নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়।

গারো-হাজং গ্রাম ও কুল্লাগড়া মন্দির

বিজয়পুর এলাকায় গারো ও হাজং জনগোষ্ঠীর গ্রাম আছে। তাদের ঘরবাড়ি, জীবনধারা দেখতে দেখতে হেঁটে বেড়ানো যায়। বিজয়পুর যাওয়ার পথে কুল্লাগড়া মন্দিরও পড়ে, কারুকাজের জন্য পরিচিত।

বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি

সুসং মহারাজার পুরনো বাড়িতে এখন উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি। গারো, হাজংসহ এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, পোশাক আর জীবনধারা সম্পর্কে জানার জায়গা এটা। যাওয়ার আগে খোলা থাকার সময়টা জেনে নেওয়া ভালো।

কমলা রাণীর দিঘী

বিরিশিরি বাজারের কাছে কমলা রাণীর দিঘী, সাগর দিঘি নামেও পরিচিত। বড় এই দিঘির মাঝে দ্বীপ আছে, পাড়ে বসে সময় কাটানো যায়।

হাজং মাতা রসমণি স্মৃতিস্তম্ভ

বিজয়পুর যাওয়ার পথে পড়ে হাজং মাতা রসমণির স্মৃতিস্তম্ভ। টংক আন্দোলনের এই বীরাঙ্গনার স্মৃতিতে তৈরি স্তম্ভটা ইতিহাসে আগ্রহীদের জন্য।

কীভাবে যাবেন

ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দুর্গাপুরগামী সরাসরি বাস ছাড়ে, রাতের বাসে উঠলে ভোরে পৌঁছানো যায়। ভাড়া বাসভেদে 300 থেকে 550 টাকার মতো, তবে ভাড়া বদলায়, তাই কাউন্টারে জেনে নিন। কিছু বাস দুর্গাপুর না গিয়ে সুখনগরী পর্যন্ত যায়, সেখান থেকে ট্রলারে সোমেশ্বরী পার হয়ে রিকশা বা বাসে দুর্গাপুর যেতে হয়। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর থেকে হাওর এক্সপ্রেস বা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে শ্যামগঞ্জ নেমে সেখান থেকে বাস বা সিএনজিতে বিরিশিরি বাজার। ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় 170-180 কিলোমিটার, যেতে 6-7 ঘণ্টা লাগে।

ঘোরার পরিকল্পনা

বেশিরভাগ স্পট সোমেশ্বরী নদীর ওপারে। সকালে নদী পার হয়ে ব্যাটারিচালিত অটো বা মোটরসাইকেল দিনভিত্তিতে ভাড়া নিলে একদিনেই চীনামাটির পাহাড়, জলাশয়, বিজয়পুর সীমান্ত, রানীখং গির্জা আর কমলার বাগান ঘোরা যায়। ভাড়া আগে থেকে ঠিক করে নিন। কালচারাল একাডেমি আর কমলা রাণীর দিঘী নদীর এপারে, দুর্গাপুর-বিরিশিরি বাজার এলাকায়। দুদিন থাকলে প্রথম দিন ওপারের স্পট, দ্বিতীয় দিন এপারের স্পট আর সোমেশ্বরীর চরে সময় কাটানো যায়।

বিজ্ঞাপন

কখন যাবেন, কোথায় থাকবেন

নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি বিরিশিরি যাওয়ার সেরা সময়। শুকনো মৌসুমে পাহাড়ের রাস্তা ভালো থাকে, আবহাওয়া ঠান্ডা। বর্ষায় নদীতে পানি বাড়ে, তখন নৌকা ভ্রমণ জমে, কিন্তু পাহাড়ের পথ পিচ্ছিল হয়। থাকার জন্য দুর্গাপুর বাজারে সাধারণ মানের হোটেল আছে। রাতে ঢাকা ফেরার নাইট কোচও পাওয়া যায়, তাই চাইলে একদিনের ট্রিপও করা সম্ভব।

খরচের ধারণা

ঢাকা থেকে দুর্গাপুর বাস ভাড়া 300 থেকে 550 টাকার মধ্যে, বাস আর সময়ভেদে। সোমেশ্বরী পার হতে ট্রলারে জনপ্রতি অল্প টাকা লাগে। নদীর ওপারে সারাদিন ঘোরার জন্য ব্যাটারিচালিত অটো ভাড়া কয়েকশ টাকার মধ্যে পড়ে, দল বেঁধে গেলে জনপ্রতি খরচ কমে। খাওয়া-দাওয়া বাজারের সাধারণ হোটেলে সেরে নেওয়া যায়। সব মিলিয়ে একদিনের ট্রিপে জনপ্রতি খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে রাখা সম্ভব, তবে ভাড়া আর দাম সময়ের সঙ্গে বদলায়, তাই যাওয়ার আগে যাচাই করে নিন।

যাওয়ার আগে জেনে রাখুন

সীমান্ত এলাকায় ঘোরার সময় স্থানীয় নিয়ম মেনে চলুন। নদীতে নামার আগে সাঁতার আর স্রোতের অবস্থা বুঝে নিন। খাবারের দোকান বাজার এলাকায় পাবেন, তবে দুপুরের খাবারের সময় মাথায় রেখে পরিকল্পনা করুন। পাহাড় বা নদীর পাড়ে প্লাস্টিক ফেলে আসবেন না।

W

লেখক

Walid Forhad

Mymensingh Info-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এডিটর।