বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড়: সাদা মাটির টিলা, নীল জলাশয় ও যাতায়াত গাইড

নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুর গ্রামে গেলে একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। সবুজ পাহাড়ের বদলে এখানে সাদা, লাল আর হলুদ মাটির টিলা, আর টিলার গায়ে গর্তে জমে থাকা নীলচে সবুজ পানির জলাশয়। এই জায়গার নাম বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড়। মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষা এই এলাকাটা এখন নেত্রকোণার সবচেয়ে পরিচিত ভ্রমণস্থানগুলোর একটা। দুর্গাপুর সদর থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে হলেও যেতে হয় সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে, আর সেই নদী পার হওয়ার অভিজ্ঞতাটাই ট্রিপের একটা বড় অংশ।
পাহাড়টা আসলে কী
বিজয়পুরের এই মাটির নাম সাদা মাটি, বৈজ্ঞানিক নাম কেওলিন। চীন দেশের মানুষ এই মাটি দিয়ে প্রথম সিরামিক বাসন বানিয়েছিল বলে এর নাম হয়েছে চিনামাটি। 1957 সালে ভেদিকুড়া এলাকায় প্রথম এই সাদা মাটির খোঁজ মেলে। পরে জরিপে দেখা যায়, বিজয়পুর আর গোপালপুর এলাকায় প্রায় 24 লাখ 70 হাজার টন সাদা মাটি মজুত আছে। সিরামিক বাসন, টাইলস, স্যানিটারি জিনিসপত্র আর কাচ তৈরিতে এই মাটি ব্যবহার হয়। 2021 সালে বিজয়পুরের সাদা মাটি বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। 2016 সালের এপ্রিল থেকে এখানে মাটি তোলা বন্ধ আছে, তাই পাহাড় আর জলাশয় এখন আগের মতোই আছে।
নীল জলাশয় আর মাটির রং
পাহাড়ের সবচেয়ে মজার ব্যাপার এর রং। একই টিলায় সাদা মাটির পাশে লাল, হলুদ, কালো, বাদামি, বেগুনি এমনকি নীল মাটির স্তর দেখা যায়। আগে মাটি তোলার পর যে গভীর গর্তগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলোয় বৃষ্টির পানি জমে এখন নীলচে সবুজ জলাশয় হয়েছে। পরিষ্কার দিনে জলাশয়ের পানিতে পাহাড়ের ছায়া পড়ে, ছবি তোলার জন্য এটাই সেরা জায়গা। জলাশয়ের পানি কিন্তু অনেক গভীর, তাই পানিতে নামা ঠিক নয়। পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট গুহার মতো গর্তও আছে, স্থানীয়রা বলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা এসব জায়গায় অবস্থান নিয়েছিলেন।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দুর্গাপুরগামী সরাসরি বাস ছাড়ে। ভাড়া বাসভেদে 300 থেকে 550 টাকার মতো, তবে ভাড়া বদলায়, তাই কাউন্টারে জেনে নিন। রাতের বাসে উঠলে ভোরে দুর্গাপুর পৌঁছানো যায়। ফেরার সময় দুর্গাপুর বাজার এলাকার তালুকদার প্লাজার সামনে থেকে রাত এগারোটা আর সাড়ে এগারোটায় ঢাকাগামী নাইট কোচ ছাড়ে। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর থেকে হাওর এক্সপ্রেস বা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে শ্যামগঞ্জ নেমে সেখান থেকে বাস বা সিএনজিতে দুর্গাপুর যাওয়া যায়।
দুর্গাপুর থেকে বিজয়পুর যেতে সোমেশ্বরী নদী পার হতে হয়। নদী পার হয়ে শিবগঞ্জ থেকে কামারখালী হয়ে বিজয়পুরের পথ। নদীর ওপারে ব্যাটারিচালিত অটো বা মোটরসাইকেল ভাড়া নিলে চীনামাটির পাহাড়, জলাশয়, বিজয়পুর সীমান্ত আর রানীখং গির্জা একসঙ্গেই ঘোরা যায়। সারাদিনের জন্য অটো ভাড়া 500 থেকে 600 টাকার মধ্যে পড়ে, দল বেঁধে গেলে জনপ্রতি খরচ কমে। ভাড়া আগে থেকে ঠিক করে নিন।
পাহাড়ে গিয়ে কী করবেন
পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে একদিকে সোমেশ্বরী নদী, আরেকদিকে মেঘালয়ের পাহাড়ের সারি দেখা যায়। সীমান্তফাঁড়ির পাশে পাহাড়ে ওঠার ব্যবস্থা আছে। চীনামাটির পাহাড় থেকে একটু এগুলেই বিজয়পুর সীমান্ত, জিরো পয়েন্টের কাছে বিজিবি ক্যাম্প। সীমান্ত এলাকা বলে এখানে নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়, ছবি তোলার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হয়। একই এলাকায় রানীখং গির্জা, পুরনো এই মিশন চার্চটা দেখার মতো। শীতের মৌসুমে পাশের টিলায় কমলার বাগানে গাছে কমলা ধরে থাকলে দৃশ্যটা আরও সুন্দর লাগে। সময় থাকলে বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি আর কমলা রাণীর দিঘীও ঘুরে আসা যায়, দুটোই দুর্গাপুর-বিরিশিরি বাজার এলাকায়। বিরিশিরি ঘোরার পুরো পরিকল্পনার জন্য আমাদের বিরিশিরি ভ্রমণ গাইড দেখে নিতে পারেন।
কখন যাবেন, খরচের ধারণা
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি বিজয়পুর যাওয়ার সেরা সময়। শুকনো মৌসুমে পাহাড়ের রাস্তা ভালো থাকে, আবহাওয়া ঠান্ডা থাকে। বর্ষায় নদীতে পানি বাড়ে, তখন নৌকা ভ্রমণ জমে, কিন্তু পাহাড়ের পথ পিচ্ছিল হয়। ঢাকা থেকে যাতায়াত, নদী পার হওয়া, সারাদিনের অটো ভাড়া আর খাওয়া দাওয়া মিলিয়ে একদিনের ট্রিপে জনপ্রতি খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে রাখা সম্ভব, তবে ভাড়া আর দাম সময়ের সঙ্গে বদলায়, তাই যাওয়ার আগে যাচাই করে নিন। থাকার জন্য দুর্গাপুর বাজারে সাধারণ মানের হোটেল আছে, আর নেত্রকোণার বিখ্যাত বালিশ মিষ্টি বাজার থেকে কিনে নিতে পারেন।
যাওয়ার আগে জেনে রাখুন
জলাশয়ের পানি অনেক গভীর, সাঁতার না জানলে পানিতে নামবেন না। সীমান্ত এলাকায় ঘোরার সময় স্থানীয় নিয়ম মেনে চলুন, বিজিবি ক্যাম্পের আশপাশে অযথা ঘোরাঘুরি করবেন না। খাবারের দোকান বাজার এলাকায় পাবেন, পাহাড়ের কাছে তেমন কিছু নেই, তাই পানি আর হালকা খাবার সঙ্গে রাখা ভালো। পাহাড় বা নদীর পাড়ে প্লাস্টিক ফেলে আসবেন না।



