📅 বৃহস্পতিবার, 5 নভেম্বর, 2026 ময়মনসিংহের তথ্যকোষ
দর্শনীয় স্থান

ময়মনসিংহের শশী লজ: রাজবাড়ির ইতিহাস, যাতায়াত ও ঘোরার সম্পূর্ণ গাইড

ময়মনসিংহ শহরের একদম মাঝখানে, কাচারি রোডে দাঁড়িয়ে আছে শশী লজ। ব্রহ্মপুত্রের কাছাকাছি এই প্রাসাদ এলাকার মানুষের কাছে ময়মনসিংহ রাজবাড়ি নামেই বেশি পরিচিত। মুক্তাগাছার জমিদার বংশের মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর এই প্রাসাদ এখন জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে। শহরের মধ্যে অল্প সময়ে ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে চাইলে শশী লজ ঘোরার তালিকায় রাখাই ভালো। জয়নুল আবেদিন পার্ক ঘোরা শেষে এখানে এসে পড়া যায় একই দিনে, দুটো জায়গা পরস্পর থেকে খুব দূরে নয়।

ইতিহাস

1877 সালে মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী এই জায়গায় একটি দোতলা প্রাসাদ তৈরি করেন। নিজের দত্তক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামেই এর নাম রাখেন শশী লজ। ইউরোপ থেকে আনা নানা শৌখিন জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো হয়েছিল মূল ভবনটি। কিন্তু 1897 সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে সেই দোতলা প্রাসাদ ধ্বংস হয়ে যায়।

এরপর শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী নিজেই নতুন নকশায় প্রাসাদটি আবার তোলেন। 1905 থেকে 1911 সালের মধ্যে নির্মিত হয় এখনকার একতলা ভবন। ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে বাঙালি ধাঁচ মিশিয়ে তৈরি এই প্রাসাদই আজ আমরা দেখি। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর 1952 সাল থেকে এখানে মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ চলে আসছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের কারণে 1989 সালে ভবনটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করা হয়, আর 2015 সালের 4 এপ্রিল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটি অধিগ্রহণ করে জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলে। এখন এটি ময়মনসিংহের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক আকর্ষণ।

বিজ্ঞাপন

কী কী দেখবেন

মূল প্রাসাদ ভবন

প্রায় 9 একর জমির ওপর দাঁড়ানো প্রাসাদের প্রশস্ত সম্মুখভাগ, খিলান আর রঙিন কাচের জানালা একনজরেই চোখে পড়ে। ভেতরে পুরনো দিনের ঝাড়বাতি আর ঘূর্ণি সিঁড়ি জমিদার আমলের জীবনযাত্রার কথা মনে করিয়ে দেয়। ইউরোপীয় ধাঁচের দরজা-জানালার সঙ্গে বাঙালি স্থাপত্যের মেলবন্ধনই এই ভবনের আসল সৌন্দর্য। জাদুঘরে ঔপনিবেশিক আমলের নানা জিনিসপত্র, পুরনো ছবি আর প্রত্নবস্তু সাজিয়ে রাখা আছে, ঘুরতে ঘুরতে জমিদারি যুগের একটা পরিষ্কার ছবি মেলে।

বাগান ও ভেনাসের ঝর্ণা

অর্ধবৃত্তাকার খিলানযুক্ত প্রধান ফটক পেরোলেই বড় ঘাসের লন। লনের মাঝখানে শ্বেতপাথরের ঝর্ণা, আর ঝর্ণার কেন্দ্রে রোমান দেবী ভেনাসের মূর্তি। এই ঝর্ণা আর মূর্তিই শশী লজের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য। ছবি তোলার জন্য জায়গাটা দারুণ। বিকেলের নরম আলোয় ঝর্ণার পানিতে রঙিন কাচের প্রতিফলন দেখার মতো হয়।

পেছনের পুকুর ও স্নানমণ্ডপ

মূল ভবনের পেছনে আছে পুরনো পুকুর। পুকুরের মাঝখানে শ্বেতপাথরের তৈরি দোতলা স্নানমণ্ডপ, জমিদার পরিবারের স্নানের ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে প্রাসাদের পেছনের দিকটাও দেখা যায়।

শুটিং স্পট

শশী লজ নানা সিনেমা আর টিভি নাটকের শুটিংয়ের জায়গা হিসেবে পরিচিত। হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত টিভি নাটক অয়োময়ের শুটিং এখানে হয়েছিল বলে জানা যায়। প্রাসাদের বারান্দা, সিঁড়ি আর বাগানের ঝর্ণা পর্দায় দেখলে অনেকেরই চেনা লাগতে পারে।

খোলার সময় ও টিকিট

সাধারণত সোমবার দুপুর 2টা থেকে বিকেল 5টা, মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার আর শনিবার সকাল 10টা থেকে বিকেল 5টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শুক্রবার সকাল 10টা থেকে দুপুর 1টা, আবার দুপুর 2টা থেকে বিকেল 5টা পর্যন্ত খোলা। রবিবার বন্ধ। মিউজিয়ামে ঢুকতে টিকিট লাগে, সাধারণত 15 টাকার মতো। সময়সূচি বদলাতে পারে, তাই যাওয়ার আগে জেনে নেওয়া ভালো।

বিজ্ঞাপন

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব প্রায় 120 কিলোমিটার। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহগামী বাসে 3 থেকে 4 ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর থেকে তিস্তা, যমুনা, অগ্নিবীণা, মোহনগঞ্জ বা হাওর এক্সপ্রেসে ময়মনসিংহ নামুন। স্টেশন বা মাসকান্দা বাস টার্মিনাল থেকে রিকশা বা অটোতে কাচারি রোডের শশী লজে পৌঁছাতে 30 থেকে 50 টাকা ভাড়া লাগে। শহরের ভেতরেই হওয়ায় হেঁটেও যাওয়া যায় কাছাকাছি থাকলে।

একদিনের পরিকল্পনা

সকালে ময়মনসিংহ পৌঁছে প্রথমে শশী লজ ঘুরুন, ভেতরে 1 থেকে 2 ঘণ্টা সময় রাখুন। জাদুঘর দেখা শেষে কাছেই জয়নুল আবেদিন পার্কে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বিকেলটা কাটান। ফেরার পথে ময়মনসিংহ জাদুঘরেও ঢুঁ মারতে পারেন। শহরের ভেতর সব স্পট কাছাকাছি হওয়ায় রিকশা বা অটোতেই একদিনে তিনটা জায়গা আরামে ঘোরা যায়।

ঘোরার আগে জেনে রাখুন

সকালে বা বিকেলের দিকে গেলে ঘোরা আরামদায়ক, দুপুরের রোদে বাগানে হাঁটা কষ্টকর হতে পারে। রবিবার বন্ধ থাকে, এই হিসাব মাথায় রেখে পরিকল্পনা করুন। জাদুঘরের ভেতরে ভদ্রতা বজায় রাখুন, জিনিসপত্রে হাত দেবেন না। ঘোরা শেষে কাচারি রোডের আশপাশে চা-নাস্তার দোকান আর খাবারের হোটেল মেলে। একই দিনে জয়নুল আবেদিন পার্ক, ময়মনসিংহ জাদুঘর আর শশী লজ মিলিয়ে শহরটা ঘুরে নেওয়া যায়।

W

লেখক

Walid Forhad

Mymensingh Info-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এডিটর।