📅 শুক্রবার, 6 নভেম্বর, 2026 ময়মনসিংহের তথ্যকোষ
দর্শনীয় স্থান

ময়মনসিংহের আলেকজান্ডার ক্যাসেল: লোহার কুঠির ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি ও যাওয়ার গাইড

ময়মনসিংহ শহরের একদম মাঝখানে, কোর্ট-কাচারি এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে আলেকজান্ডার ক্যাসেল। এলাকার মানুষ একে লোহার কুঠি নামেই বেশি চেনে। শশী লজ থেকে আধা কিলোমিটারেরও কম দূরে, টিচার্স ট্রেনিং কলেজের চত্বরের ভেতর এই পুরনো ভবনটা দাঁড়িয়ে আছে ব্রহ্মপুত্রের কাছাকাছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1926 সালে এখানে চার দিন ছিলেন, এই একটা তথ্যই জায়গাটাকে ময়মনসিংহের ইতিহাসে আলাদা করে রাখে।

ইতিহাস

1879 সালে মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী এই ভবনটি তৈরি করেন। তখন খরচ হয়েছিল 45 হাজার টাকা। মহারাজার অতিথিশালা হিসেবে বানানো হয়েছিল এটি, দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট অতিথিরা ময়মনসিংহে এলে এখানেই থাকতেন।

নামটা নিয়ে দুটি গল্প চালু আছে। একদল বলে, ময়মনসিংহের প্রথম জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এন এস আলেকজান্ডারের নামে এর নাম রাখা হয়। আরেকদল বলে, নাম রাখা হয়েছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেকজান্ড্রার নামে। দুটি গল্পই আজও মুখে মুখে ঘোরে, কোনোটাকেই একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিজ্ঞাপন

ভবনটি রং মহল নামেও পরিচিত ছিল। ভবনের গায়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড আর তাঁর স্ত্রী আলেকজান্ড্রার তৈলচিত্র আঁকা হয়েছিল বলে জানা যায়, সেই চিত্র থেকেই আলেকজান্ড্রার নামে ভবনের নাম রাখার গল্পটা আরও জোর পায়।

রবীন্দ্রনাথের চার দিন

1926 সালের 15 ফেব্রুয়ারি দুপুরে ট্রেনে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সঙ্গে ছিলেন ছেলে রথীন্দ্রনাথ, পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীসহ আরও কয়েকজন। 19 ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার দিন তিনি এই ক্যাসেলেই ছিলেন। বলা হয়, এখানে থাকার সময় বড় গাছের নিচে বসে তিনি কবিতা লিখেছিলেন। ক্যাসেলের চত্বরটা তাই আজ রবীন্দ্র বটমূল নামেও পরিচিত।

একই বছর মহাত্মা গান্ধীও এখানে এসেছিলেন। এ ছাড়া লর্ড কার্জন, চিত্তরঞ্জন দাশ, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এই ভবনে অতিথি হয়েছিলেন বলে জানা যায়।

ভবনটা কেমন

দোতলা এই ভবন তৈরি হয়েছিল লোহা আর বার্মা টিক কাঠ দিয়ে। ভেতরে কাঠের সিঁড়ি, লোহার নানা কাজ, ওপরে ঢালু লোহার ছাদ। ব্রহ্মপুত্রের বন্যার পানি থেকে বাঁচাতে ভবনটা বসানো হয়েছিল উঁচু ভিতের ওপর। ভেতরের মেঝে ছিল সাদা পাথরের, মোট 14টি ঘর ছিল দুই তলায়। মূল ফটকের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে সাদা রঙের দুটি গ্রিক ভাস্কর্য, এগুলোই ভবনের সবচেয়ে চেনা দৃশ্য। সামনে পুরনো বটগাছ আর খেলার মাঠ, চারপাশে সবুজ।

নির্মাণের কারিগরি নিয়েও নানা কথা চালু আছে। স্থানীয়দের মতে, মহারাজা বার্মা থেকে ভালো মানের টিক কাঠ আনিয়েছিলেন, আর কাজ করেছিলেন চীন থেকে আনা কারিগররা। প্রত্নতত্ত্ববিদ স্বপন ধর জানিয়েছেন, ভারত থেকে আনা অভ্র দিয়ে ভবনটা ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা ছিল। একসময় চত্বরে বাগান আর পুকুর ছিল, তার কিছু চিহ্ন এখনো চোখে পড়ে। লোহার রেলিং, ল্যুভার দেওয়া জানালা আর ছাদের কারুকাজ এখনো জমিদার আমলের রুচির কথা বলে।

এখনকার অবস্থা

দেশভাগের পর 1948 সালে ক্যাসেল ঘিরে গড়ে ওঠে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। এরপর ভবনটা কলেজের গ্রন্থাগার আর শিক্ষকদের আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। দোতলার অবস্থা এখন বিপজ্জনক, তাই ওপরের তলা অনেক দিন ধরে বন্ধ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, তবে সংস্কারের কাজ এখনো পুরোপুরি হয়নি। নিচতলার গ্রন্থাগার এখনো আছে, তবে খুব একটা ব্যবহার হয় না। ফটকের দুই পাশের গ্রিক ভাস্কর্যেও সময়ের ছাপ পড়েছে।

ভবনটি এখন জরাজীর্ণ, ভেতরে ঢোকা যায় না। বাইরে থেকে ভবনটা দেখা যায়, চত্বরে ঘোরা যায়, ছবি তোলা যায়। ভেতরে ঢোকার আশা নিয়ে গেলে হতাশ হতে হবে, তাই বাইরে থেকেই দেখার পরিকল্পনা করে যাওয়া ভালো।

বিজ্ঞাপন

কীভাবে যাবেন

ক্যাসেল শহরের প্রাণকেন্দ্রে, টাউন হল মোড় থেকে পূর্ব দিকে কোর্ট-কাচারির দিকে হেঁটে গেলে 5 থেকে 10 মিনিট লাগে। শহরের যেকোনো প্রান্ত থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় যাওয়া যায়। চত্বরে ঢুকতে কোনো টিকিট লাগে না। চত্বর দিনের বেলায় খোলা থাকে, তবে এটি কলেজের চত্বর বলে সময় বদলাতে পারে। কলেজ চলাকালীন চত্বরে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা থাকে, ঘোরার সময় সেদিকে খেয়াল রাখা ভালো।

ঘোরার জন্য সকাল বা বিকেলের দিকটা ভালো, নরম আলোয় ভবনের ছবি ভালো আসে। শীতের মাস নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ঘোরার সেরা সময়।

একই দিনে আশপাশে

ক্যাসেল থেকে হাঁটা দূরত্বে শশী লজ, ময়মনসিংহের রাজবাড়ি। একই দিনে দুটো জায়গাই ঘুরে নেওয়া যায়। কাছেই জয়নুল আবেদিন পার্ক আর সংগ্রহশালা, বিকেলটা সেখানে কাটানো যায়। শহরের মধ্যে অল্প সময়ে ইতিহাস আর নদীর হাওয়া একসঙ্গে পেতে চাইলে এই তিনটি জায়গা একসঙ্গে ঘোরার তালিকায় রাখা যায়।

W

লেখক

Walid Forhad

Mymensingh Info-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এডিটর।