মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি: আট আনি রাজবাড়ির ইতিহাস, মণ্ডা ও যাওয়ার গাইড

ময়মনসিংহ শহর থেকে পশ্চিমে মাত্র আধা ঘণ্টার পথে মুক্তাগাছা। এই ছোট শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি, যাকে সবাই আট আনি রাজবাড়ি নামেও চেনে। প্রায় তিনশো বছরের পুরনো এই রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ময়মনসিংহ জমিদারির শুরু, আর আছে দেশজোড়া খ্যাত মুক্তাগাছার মণ্ডা। এক বেলার ঘোরার জন্য জায়গাটা একেবারে ঠিকঠাক।
ইতিহাস
মুক্তাগাছা জমিদারির শুরু 1727 সালে। বগুড়া থেকে আসা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী নবাব আলীবর্দী খাঁর কাছ থেকে আলাপসিং পরগনার জমিদারি পান। তখন এই জায়গার নাম ছিল বিনোদবাড়ি। গল্প আছে, স্থানীয় কামার মুক্তারাম কর্মকার জমিদারকে পিতলের তৈরি একটা গাছা উপহার দিয়েছিলেন। সেই গাছা থেকে জায়গার নাম হয় মুক্তাগাছা, মুক্তারাম থেকে মুক্তা আর গাছা থেকে গাছা।
পরের প্রজন্মের হাতে জমিদারি আরও বড় হয়। ব্রিটিশ আমলে মুক্তাগাছার জমিদাররা প্রথমে রাজা, পরে মহারাজা উপাধি পান। তখন থেকেই এই বাড়ি রাজবাড়ি নামে পরিচিত। জমিদারি একসময় 16টি ভাগে ভাগ হয়ে যায়, 16 জন জমিদার আলাদা আলাদা বাড়িতে থাকতেন। মূল রাজবাড়ির ভবনগুলো একসঙ্গে তৈরি হয়নি। 1750-60 সালের দিকে নির্মাণ শুরু হয়ে পরের প্রজন্মের হাতে ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে বলে জানা যায়। এই পরিবারের হাতেই পরে ময়মনসিংহ শহরে শশী লজ আর আলেকজান্ডার ক্যাসেল গড়ে ওঠে।
রাজবাড়ির ভেতরে যা আছে
রাজবাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে বড় সিংহদ্বার। ভেতরে ফটকের দুই পাশে সাজানো ভবন, মাঝখানে খোলা চত্বর, পুকুর আর পুরনো মন্দির। আট আনি প্রাসাদের পাশেই আছে দুর্গা মন্দির আর রাজরাজেশ্বরী মন্দির। আছে তোষাখানা, লোহার তৈরি দোতলা হাওয়াখানা আর নাটমন্দির। নাটমন্দিরের ঘূর্ণায়মান মঞ্চ ভূপেন্দ্র রঙ্গপীঠ একসময় এই রাজবাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা ছিল, এখন তা ভগ্নদশায় আছে। অন্দরমহলের দিকে বড় উঠোন ঘিরে থাকার ঘরগুলো সাজানো।
পুরনো রাজবাড়ির নকশা ছিল চার ভাগে ভাগ করা: কাছারি, থাকার মহল, ধর্মীয় অংশ আর অন্দরমহল। চারপাশে ছিল আয়মন নদী থেকে কাটা পরিখা, যা রাজবাড়িকে ঘিরে রাখত। আজকের চত্বরে সেই পুরনো নকশার সবটুকু আর নেই, তবে ফটক, মন্দির আর উঠোন ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলো দেখলে জমিদার আমলের সেই জাঁকজমকের একটা আন্দাজ পাওয়া যায়।
মুক্তাগাছার মণ্ডা
রাজবাড়ির সামনেই গোপাল পালের মণ্ডার দোকান। মুক্তাগাছার মণ্ডা তৈরি হচ্ছে 1824 সাল থেকে বলে জানা যায়, জমিদার আমলের এই মিষ্টি এখন দেশজোড়া পরিচিত। রাজবাড়ি ঘুরে মণ্ডা না খেয়ে ফেরা প্রায় অসম্ভব, দোকানটা একদম ফটকের পাশেই।
এখনকার অবস্থা
1947 সালের পর জমিদার পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য ভারতে চলে যান। 1971 সালের যুদ্ধের সময় রাজবাড়ির অনেক মূল্যবান জিনিস লুট হয়। 1993 সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর আট আনি প্রাসাদসহ চারটি মন্দির সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ফটক আর কিছু ভবন সংস্কার করা হয়েছে, তবে বেশির ভাগ অংশই এখনো ভগ্নদশায় আছে। সংস্কার শেষে এখানে জাদুঘর করার কথা আছে।
16টি জমিদার বাড়ির অনেকগুলো এখন আর রাজবাড়ির অংশ নয়। সেগুলোতে এখন শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ নানা সরকারি প্রতিষ্ঠান চলছে। রাজবাড়ি চত্বরে গেলে এই পুরনো বাড়িগুলোর কিছু এখনো চোখে পড়বে।
কীভাবে যাবেন
ময়মনসিংহ শহরের টাউন হল মোড় থেকে মুক্তাগাছার বাস আর সিএনজি পাওয়া যায়। ভাড়া জনপ্রতি প্রায় 30 টাকা, সময় লাগে 30 থেকে 40 মিনিট। রিজার্ভ সিএনজিতে গেলে ভাড়া 200 থেকে 250 টাকার মতো পড়ে। মুক্তাগাছা বাসস্ট্যান্ডে নেমে রিকশায় কলেজ রোডের রাজবাড়ি, হেঁটেও যাওয়া যায়, সময় লাগে 15 থেকে 20 মিনিট।
রাজবাড়ি খোলা থাকে মঙ্গলবার থেকে শনিবার সকাল 9টা থেকে বিকেল 5টা পর্যন্ত, সোমবার দুপুর 2টা থেকে বিকেল 5টা পর্যন্ত। রবিবার বন্ধ থাকে। এই সময় গুগলের তালিকা অনুযায়ী দেওয়া হলো, যাওয়ার আগে একবার যাচাই করে নেওয়া ভালো। প্রবেশে কোনো টিকিট লাগে না বলে জানা যায়।
ঘোরার সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, শীতের নরম রোদে রাজবাড়ির সাদা ভবন আর পুরনো স্থাপত্যের ছবি ভালো আসে। সকালে গেলে ভিড় কম থাকে। রাজবাড়ির ভেতরে অনেক ভবন এখনো ভগ্নদশায় আছে, তাই বন্ধ ঘরে ঢোকার চেষ্টা না করে চত্বর আর খোলা অংশ ঘুরে দেখাই ভালো।
একই দিনে আশপাশে
মুক্তাগাছা থেকে ফেরার পথে ময়মনসিংহ শহরে শশী লজ আর আলেকজান্ডার ক্যাসেল দেখে নেওয়া যায়। দুটোই এই একই জমিদার পরিবারের তৈরি। সকালে মুক্তাগাছা রওনা দিয়ে দুপুরে মণ্ডা খেয়ে বিকেলে শহরে ফিরলে এক দিনে ময়মনসিংহের জমিদার আমলের তিনটি স্থাপনাই দেখা হয়ে যায়।



