রাজার পাহাড় শেরপুর: গারো পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু টিলা, কর্ণঝোড়া যাওয়ার গাইড

শেরপুর শহর থেকে উত্তরে সীমান্তের দিকে প্রায় 41 কিলোমিটার গেলে শ্রীবরদী উপজেলার কর্ণঝোড়া বাজার। বাজারের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে রাজার পাহাড়, গারো পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু টিলা বলে যাকে চেনে এ অঞ্চলের মানুষ। শাল গজারির বন, উঁচু নিচু সবুজ ঢেউ আর পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে চলা ঢেউফা নদী মিলে জায়গাটার চেহারা। শেরপুরের পাহাড়ি এলাকায় বেড়াতে গেলে এটা একদিনের ট্রিপের ভালো ঠিকানা। শেরপুরের সীমান্তঘেঁষা ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী আর নালিতাবাড়ী উপজেলাজুড়ে প্রায় 19 হাজার একর বনভূমিতে ছড়িয়ে আছে গারো পাহাড়, রাজার পাহাড় সেই পাহাড়শ্রেণিরই একটা অংশ।
চূড়ায় উঠলে যা দেখবেন
রাজার পাহাড়ের চূড়ায় আছে শতাধিক হেক্টর সবুজে ছাওয়া সমতল ভূমি। পাহাড়ের গায়ে সারি সারি শাল, গজারি আর সেগুন গাছ, টিলার ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট ঝোপ আর লতাপাতা। চূড়ায় দাঁড়িয়ে আশপাশের কর্ণঝোড়া, মালাকোচা, দিঘলাকোনা, হারিয়াকোনা, চান্দাপাড়া, বাবেলাকোনা আর ভারতের সীমান্ত এলাকা একসাথে চোখে পড়ে। পরিষ্কার দিনে দূরের টিলাগুলো আর সীমান্তের ওপারের সবুজ দেখতে সবচেয়ে ভালো লাগে। সিলেট বা বান্দরবানের পাহাড়ের সাথে এর চেহারার মিল না থাকলেও সবুজের দিক থেকে রাজার পাহাড় কারও চেয়ে কম নয়।
পাহাড়ের নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে ঢেউফা নদী। বর্ষায় এই নদী কানায় কানায় ভরে ওঠে, তখন নদীর ধার আর পাহাড়ের গোড়ার দৃশ্য অন্যরকম হয়। শীতের সময় নদীর পানি কমে যায়, তখন নদীর ধারে বসে সময় কাটানো যায়। পাহাড়, নদী আর বন, এই তিন মিলেই রাজার পাহাড়ের আসল রূপ।
নামের পেছনের গল্প
জনশ্রুতি আছে, প্রাচীনকালে এখানে এক স্বাধীন রাজ্য ছিল, যার রাজা ছিলেন অত্যন্ত প্রতাপশালী। সেই রাজার নামেই নাকি পাহাড়ের নাম হয়েছে রাজার পাহাড়। স্থানীয়রা আরও বলেন, অনেক আগে পাগলা দারোগা নামে এক ব্যক্তি পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। গল্পগুলো কতটা পুরনো তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না, তবে নামের সাথে রাজার এই যোগসূত্র এলাকার মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়।
পাশের বাবেলাকোনা গ্রাম
রাজার পাহাড় ঘেঁষা জনপদ বাবেলাকোনা। এখানে গারো, হাজং আর কোচ সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে, তাদের সংস্কৃতি আর জীবনযাত্রা এই এলাকার একটা আলাদা দিক। গ্রামে আছে বাবেলাকোনা কালচারাল একাডেমি, জাদুঘর, লাইব্রেরি, গির্জা আর মন্দির। পাহাড় দেখার সাথে সাথে এই গ্রামটা ঘুরে দেখলে শেরপুরের সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবন কাছ থেকে দেখা যায়।
পাহাড়ের কাছেই আছে বিজিবি ক্যাম্প, বন বিভাগের বিট অফিস আর রাবার বাগান। রাবার বাগানের সারি সারি গাছ আর পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটলে এলাকার চেহারাটা আরও ভালো করে বোঝা যায়।
কখন যাবেন
রাজার পাহাড় যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময় আবহাওয়া ঠান্ডা আর শুকনো থাকে, পাহাড়ে হাঁটতে আরাম লাগে, আর পরিষ্কার আকাশে চূড়া থেকে দূরের দৃশ্য ভালো দেখা যায়। বর্ষায় পাহাড় আরও সবুজ হয়, কিন্তু সীমান্তবর্তী সড়ক থেকে পাহাড় পর্যন্ত শেষ প্রায় 1 কিলোমিটার রাস্তা কাঁচা আর বন্ধুর, বর্ষায় সেখানে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। সকালে রওনা দিয়ে বিকেলের মধ্যে ঘুরে আসা যায়, দিনের আলো থাকতেই ফিরে আসতে হয়।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে শেরপুর শহরে আসতে হয়, দূরত্ব প্রায় 200 কিলোমিটার, সময় লাগে প্রায় 5 ঘণ্টা। ময়মনসিংহ হয়েও শেরপুরের বাস ধরা যায়। শেরপুর শহর থেকে বাস বা সিএনজিতে শ্রীবরদী উপজেলা শহরে যেতে হয়। শ্রীবরদী থেকে সিএনজিতে কর্ণঝোড়া বা বালিঝুড়ি বাজার, আর এই দুই বাজারের মাঝামাঝি 3 থেকে 4 কিলোমিটার দূরে রাজার পাহাড়। শেষটুকু রিজার্ভ অটোতে যাওয়া যায়। ভাড়া সময়ের সাথে বদলায়, তাই রওনা হওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নেওয়া ভালো।
একদিনের ট্রিপে আশপাশে যা ঘুরবেন
একই সীমান্ত এলাকায় গজনী অবকাশকেন্দ্র, মধুটিলা ইকোপার্ক, হরিয়াকোনা, বাবেলাকোনা আর নাকুগাঁও স্থলবন্দর আছে। গজনী থেকে সীমান্ত সড়ক ধরে রাজার পাহাড়ের দিকে যাওয়া যায়, তবে একদিনে সব জায়গা ঘুরে দেখা কঠিন। তাই আগে থেকে ঠিক করে নেওয়া ভালো কোন জায়গাগুলো দেখবেন। রাজার পাহাড়ের সাথে বাবেলাকোনা গ্রাম আর কাছের রাবার বাগান একসাথে ঘুরলে একদিনের ট্রিপটা পুরো হয়।
যাওয়ার আগে জেনে রাখা ভালো
রাজার পাহাড় সীমান্ত এলাকায়, পাশেই বিজিবি ক্যাম্প আছে, তাই সেখানে সতর্ক হয়ে চলাফেরা করতে হয়। সীমান্তের দিকে অযথা এগিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। পাহাড়ে ওঠার পথে পানি আর হালকা খাবার সাথে রাখা ভালো। রাতে থাকতে চাইলে বন বিভাগের ডাকবাংলো আর লাউচাপড়ার কাছে বনফুল রিসোর্টের কথা শোনা যায়, তবে যাওয়ার আগে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো।



