📅 রবিবার, 8 নভেম্বর, 2026 নেত্রকোণার তথ্যকোষ
দর্শনীয় স্থান

বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি, নেত্রকোণা: গারো-হাজং সংস্কৃতি, জাদুঘর ও যাতায়াত গাইড

নেত্রকোণার দুর্গাপুরে বিরিশিরি গেলে বেশিরভাগ মানুষের চোখ থাকে চীনামাটির পাহাড় আর সোমেশ্বরী নদীর দিকে। কিন্তু নদীর এপারে বিরিশিরি বাজারের কাছেই আছে আরেকটা জায়গা, যেখানে গেলে এই এলাকার আসল পরিচয়টা বোঝা যায়। সেটা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি। গারো, হাজং, কোচ, বানাইসহ এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, গান, নাচ আর জীবনধারা ধরে রাখার কাজটাই করে এই একাডেমি। বিরিশিরি ঘুরতে গেলে এখানে একবার ঢুঁ মারা উচিত।

একাডেমিটা কোথায়, কী এটা

একাডেমি বিরিশিরিতে, দুর্গাপুর উপজেলা সদরের কাছেই। নেত্রকোণা শহর থেকে দূরত্ব প্রায় 30 কিলোমিটার। 1977 সালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ প্রকল্পের আওতায় প্রায় 3.21 একর জায়গার ওপর একাডেমিটি গড়ে ওঠে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, চর্চা আর লালন করাই এর কাজ। এখন এটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চলে। একাডেমির প্রথম পরিচালক ছিলেন বিবা সাংমা।

একাডেমির ভেতরে চারটি শাখা আছে: সংস্কৃতি, গবেষণা, লাইব্রেরি আর জাদুঘর। সবুজ গাছপালায় ঘেরা ক্যাম্পাসে দোতলা মূল ভবনের পাশাপাশি একটা অডিটোরিয়াম আর গেস্ট হাউস আছে।

বিজ্ঞাপন

ভেতরে যা দেখবেন

দোতলায় উপজাতীয় জাদুঘর। এখানে গারো, হাজংসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত জিনিসপত্র, পোশাক, বাদ্যযন্ত্র আর হাতের কাজ সাজিয়ে রাখা হয়েছে। একবার চোখ বুলিয়ে গেলে বোঝা যায়, এই মানুষগুলোর জীবনধারা আমাদের চেনা জীবন থেকে কতটা আলাদা, আবার কতটা কাছাকাছি। লাইব্রেরিতে এ অঞ্চলের সংস্কৃতি আর ইতিহাস নিয়ে বইপত্র আছে।

একাডেমিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদের জন্য তিন বছরের একটা কোর্স চলে। সেখানে ঐতিহ্যবাহী নাচ, গান, নাটক আর লোকজ উৎসবের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বছরের বিভিন্ন সময় এখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। পহেলা বৈশাখে একাডেমি চত্বরে দিনব্যাপী গান আর নাচের অনুষ্ঠান বসে, দেশের নানা জায়গা থেকে দর্শনার্থী আসে।

ক্যাম্পাসের ভেতরে হাঁটলে গাছের ছায়া আর ফুলের বাগান চোখে পড়ে। অডিটোরিয়ামে মাঝে মাঝে অনুষ্ঠান হয়, আর গেস্ট হাউসে দূর থেকে আসা শিল্পী আর অতিথিরা থাকেন। একাডেমি শুধু দেখার জায়গা নয়, এখানে এলে গারো আর হাজং পরিবারের মানুষজনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও মেলে, তাদের গান আর নাচের কথা সরাসরি শোনা যায়।

গারো-হাজং সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র

দুর্গাপুর, কলমাকান্দা আর আশপাশের এলাকায় গারো, হাজং, কোচ, ডালু, মান্দাই, বানাই, হাদি আর রাজবংশী জনগোষ্ঠীর বড় বসতি আছে। এদের প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষা, পোশাক, খাবার আর উৎসব আছে। গারোদের সবচেয়ে বড় উৎসব ওয়ানগালা, শীতের দিকে ফসল তোলার সময় এই উৎসব হয়। একাডেমির কাজ এই সংস্কৃতিগুলোকে শুধু সংরক্ষণ করা নয়, মূলধারার মানুষের সামনে তুলে ধরাও।

একাডেমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা সাহিত্যের নামও। কবি রফিক আজাদ 1998 সাল থেকে পাঁচ বছর এই একাডেমির পরিচালক ছিলেন। এই সময়ে তিনি লেখেন তার কবিতার বই 'বিরিশিরি পর্ব'।

আশপাশে আর যা ঘুরবেন

একাডেমি দেখে বেরিয়ে বিরিশিরির বাকি জায়গাগুলো ঘুরে নেওয়া যায়। কাছেই সোমেশ্বরী নদী, নদী পার হলেই বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড় আর নীল জলাশয়। একাডেমির কাছাকাছি সুসং রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ, একসময়ের সুসং রাজাদের বাড়ি। বিরিশিরি বাজারের কাছে কমলা রাণীর দিঘী, সাগর দিঘি নামেও পরিচিত। আরেকটু এগিয়ে গেলে রানীখং গির্জা আর বিজয়পুর সীমান্ত। একদিনের ট্রিপে এই সবকটা জায়গা একসঙ্গে ঘোরা যায়, পুরো পরিকল্পনা আছে আমাদের বিরিশিরি ভ্রমণ গাইডে।

বিজ্ঞাপন

কীভাবে যাবেন

ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দুর্গাপুরগামী সরাসরি বাস ছাড়ে। ভাড়া বাসভেদে 300 থেকে 550 টাকার মতো, ভাড়া বদলায় বলে কাউন্টারে জেনে নেওয়া ভালো। রাতের বাসে উঠলে ভোরে দুর্গাপুর পৌঁছানো যায়। ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় 170 থেকে 180 কিলোমিটার, যেতে 6 থেকে 7 ঘণ্টা লাগে। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর থেকে হাওর এক্সপ্রেস বা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে জারিয়া স্টেশনে নেমে সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় বিরিশিরি যাওয়া যায়। ময়মনসিংহ থেকে শ্যামগঞ্জ হয়ে উৎরাইল বাজারের দিক দিয়ে দুর্গাপুর যাওয়া যায়। দুর্গাপুর সদর থেকে বিরিশিরি কাছেই, রিকশায় যাওয়া যায়।

ঘোরার সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময় নদীর পানি কমে বালুচর বেরিয়ে আসে, আকাশ পরিষ্কার থাকে, হাঁটতে আর ছবি তুলতে ভালো লাগে।

যাওয়ার আগে জেনে রাখুন

একাডেমির জাদুঘর রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার খোলা থাকে। জাদুঘরে প্রবেশ মূল্য 10 টাকা। সময় আর প্রবেশ মূল্য বদলাতে পারে, তাই যাওয়ার আগে একবার জেনে নেওয়া ভালো। সকালের দিকে গেলে জাদুঘর ঘুরে দুপুরের আগেই নদীর পাড়ে সময় কাটানো যায়। একাডেমি চত্বরে শান্তভাবে ঘোরাঘুরি করুন, জাদুঘরের জিনিসপত্রে হাত দেবেন না। দুর্গাপুরে দুপুরের খাবারের জন্য স্থানীয় রেস্তোরাঁ আছে, আর নেত্রকোণায় এলে বালিশ মিষ্টির স্বাদ নিতে ভুলবেন না।

W

লেখক

Walid Forhad

Mymensingh Info-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এডিটর।