রানীখং গির্জা, নেত্রকোণা: বিজয়পুর সীমান্ত, কমলার বাগান ও যাতায়াত গাইড

নেত্রকোণার দুর্গাপুরে গিয়ে বিজয়পুর সীমান্তের দিকে এগোলে পথের পাশে একটা উঁচু টিলার ওপর চোখে পড়ে পুরনো এক গির্জা। এটাই রানীখং গির্জা, সাধু যোসেফের নামে এই ক্যাথলিক ধর্মপল্লী গড়ে উঠেছে শত বছরেরও আগে। টিলার ওপর থেকে নিচে বয়ে যাওয়া সোমেশ্বরী নদী, দূরে মেঘালয়ের পাহাড় আর পাশেই বিজয়পুর সীমান্ত, সব মিলিয়ে জায়গাটা দুর্গাপুরের ভ্রমণে একটা আলাদা থামার জায়গা।
গির্জাটা কোথায়
রানীখং গির্জা দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নে, উপজেলা পরিষদ থেকে প্রায় 6 কিলোমিটার উত্তরে। সোমেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষে উঁচু এক টিলার ওপর পুরো মিশন এলাকাটা। দুর্গাপুর সদর থেকে শিবগঞ্জ হয়ে বিজয়পুর সড়ক ধরে এগোলে গির্জাটা পথেই পড়ে, বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্পের আগেই। টিলার ঢালু পথ বেয়ে ওপরে উঠতে হয়, উঠতে উঠতে নিচের নদী আর আশপাশের সবুজ ধীরে ধীরে চোখে পড়ে।
শত বছরের পুরনো গির্জার গল্প
গির্জাটি গড়ে ওঠে 1910 থেকে 1915 সালের মধ্যে, সে হিসেবে এর বয়স এখন শত বছরের বেশি। সাধু যোসেফের নামে এই ধর্মপল্লী এলাকার খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের একমাত্র উপাসনালয় হিসেবে পরিচিত। পাঁচটি চূড়াসহ গির্জাটির স্থাপত্যশৈলী দূর থেকেই চোখে পড়ে। টিলার দক্ষিণ দিকে গির্জার প্রবেশদ্বার, ঢোকার মুখে সাধু যোসেফের মূর্তি। পাশে ধর্মপাল বিশপ হার্কসহ পাঁচ গারো হাজং আদিবাসীর মূর্তি সংবলিত একটি ভাস্কর্য আর যিশু খ্রিষ্টের মূর্তি আছে। গির্জার পাশে মিশনের দাতব্য চিকিৎসালয়, দুটি স্কুল আর একটি ডাকঘর আছে, শান্তিনিকেতন নামে একটা বিশ্রামাগারও আছে।
রানীখং নামটা নিয়ে একটা লোককথা চালু আছে। কথিত আছে, একসময় এই জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় খং নামে এক রাক্ষসী রানী থাকত, গারো আদিবাসীরা তাকে পরাস্ত করে এখানে বসতি গড়ে। সেই রানীর নাম থেকেই জায়গার নাম রানীখং। নামের সঠিক ইতিহাস নিয়ে অবশ্য নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
2026 সালের 28 অক্টোবর রাতে ধর্মপল্লীর প্রায় 40 কেজি ওজনের ঘণ্টাটি চুরি হয়ে যায়। দুই দিন পর 30 অক্টোবর সকালে শিবগঞ্জ-বিজয়পুর সড়কের পাশের একটি ডোবা থেকে পুলিশ ঘণ্টাটি উদ্ধার করে।
টিলার ওপর থেকে যা দেখা যায়
টিলার পূর্ব পাশে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালে অনেক নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া সোমেশ্বরী নদী দেখা যায়। পাহাড়ি এই নদী মেঘালয়ের গারো পাহাড় থেকে নেমে বাংলাদেশে ঢুকেছে এই বিজয়পুর সীমান্ত দিয়েই। টিলার ওপর থেকে নদীর বাঁক, বালুচর আর দূরের পাহাড়ের সারি একসঙ্গে চোখে পড়ে। ভোরের আলোয় আর বিকেলের দিকে এখানকার দৃশ্য সবচেয়ে সুন্দর লাগে।
বিজয়পুর সীমান্ত আর কমলার বাগান
গির্জা থেকে একটু এগোলেই বিজয়পুর সীমান্ত আর বিজিবি ক্যাম্প। সীমান্তের কাছে দাঁড়িয়ে ভারতের মেঘালয়ের সবুজ পাহাড় দেখা যায়। সীমান্ত এলাকা বলে এখানে নিয়ম মেনে চলতে হয়, ক্যাম্পের কাছাকাছি ছবি তোলা বা সীমান্তের ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করা যায় না। বিজিবি ক্যাম্পের কাছেই কমলার বাগান, শীতের মৌসুমে টিলার গাছে কমলা ধরে। শীতকালে গেলে বাগানে পাকা কমলার দৃশ্য দেখা যায়। রানীখং, বিজয়পুর সীমান্ত আর চীনামাটির পাহাড় একই দিনে ঘুরে নেওয়া যায়, কারণ সবগুলোই দুর্গাপুরের উত্তর দিকের এই একই এলাকায়।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দুর্গাপুরগামী সরাসরি বাস ছাড়ে। ভাড়া বাসভেদে 300 থেকে 550 টাকার মতো, ভাড়া বদলায় বলে কাউন্টারে জেনে নেওয়া ভালো। রাতের বাসে উঠলে ভোরে দুর্গাপুর পৌঁছানো যায়। ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় 170 থেকে 180 কিলোমিটার, যেতে 6 থেকে 7 ঘণ্টা লাগে। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর থেকে হাওর এক্সপ্রেস বা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে শ্যামগঞ্জ নেমে সেখান থেকে বাস বা সিএনজিতে দুর্গাপুর যাওয়া যায়। ময়মনসিংহ থেকে দুর্গাপুরের বাসে 1 থেকে 2 ঘণ্টা লাগে। দুর্গাপুর সদর থেকে শিবগঞ্জ হয়ে বিজয়পুর সড়ক ধরে অটো বা মোটরসাইকেলে রানীখং গির্জা যাওয়া যায়, বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্পের পথেই গির্জাটা পড়ে।
কখন গেলে ভালো
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, এই সময়টাই রানীখং আর বিজয়পুর ঘোরার সেরা সময়। শীতকালে সোমেশ্বরীর পানি কমে বালুচর বেরিয়ে আসে, আকাশ পরিষ্কার থাকে, পাহাড়ের দৃশ্য ভালো দেখা যায়। কমলার বাগানে কমলা ধরেও এই মৌসুমেই। বর্ষায় ভরা নদী আর সবুজের রূপ আলাদা, তবে পাহাড়ি পথে চলাচলে সাবধান থাকতে হয়। দিনের ট্রিপ হিসেবে সকালে রওনা দিয়ে বিকেলের মধ্যে দুর্গাপুর ফেরা যায়।
যাওয়ার আগে জেনে রাখুন
গির্জা একটা ধর্মীয় জায়গা, ভেতরে ঢুকলে শান্তভাবে ঘুরতে হয়, প্রার্থনার সময় ছবি তোলা থেকে বিরত থাকা ভালো। সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নির্দেশ মেনে চলতে হয়, সীমান্ত পিলারের ওপারে যাওয়া যায় না। শীতের সকালে আর বিকেলে এখানে ঠান্ডা পড়ে, সঙ্গে হালকা গরম কাপড় রাখলে ভালো। দুর্গাপুর থেকে একদিনের ট্রিপে রানীখং গির্জা, বিজয়পুর সীমান্ত, কমলার বাগান আর চীনামাটির পাহাড় একসঙ্গে ঘোরা যায়।



