সোমেশ্বরী নদী, নেত্রকোণা: সোনালি বালুচর, নৌকা ভ্রমণ ও যাতায়াত গাইড

নেত্রকোণার দুর্গাপুরে গিয়ে সোমেশ্বরী নদীর পাড়ে দাঁড়ালে প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়ে, সেটা পানির রং। বাংলাদেশের বেশিরভাগ নদীর পানি ঘোলা হলেও সোমেশ্বরীর পানি পরিষ্কার, নদীর তলার বালু আর নুড়ি অনেক সময় ওপর থেকেই দেখা যায়। নদীর দুপাশে সোনালি বালুচর, আর দূরে মেঘালয়ের পাহাড়ের সারি। দুর্গাপুর আর বিরিশিরিকে আলাদা করে বয়ে যাওয়া এই নদীই এলাকার ভ্রমণের কেন্দ্রবিন্দু। চীনামাটির পাহাড় দেখতে গেলেও এই নদী পার হতে হয়, আবার নদীর পাড়ে বিকেল কাটাতেও মানুষ আসে দূর থেকে।
নদীটা কোথা থেকে আসে
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের নকরেক পর্বতশ্রেণি থেকে এই নদীর শুরু। মেঘালয়ে এর নাম সিমসাং, গারো ভাষায় সিমসাং ওয়ারি। পাহাড় থেকে নেমে নদীটা বাংলাদেশে ঢোকে নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলা দিয়ে, রানীখং পাহাড়ের কাছ দিয়ে। তারপর জারিয়া হয়ে দক্ষিণে বয়ে গিয়ে মেশে কংস নদীতে। আরেকটি শাখা কলমাকান্দার দিকে গিয়ে বালিয়া নদীতে মেশে। পাহাড়ি নদী বলে এর স্রোত আর পানির রং ঋতুর সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। একসময় এই নদীতে মহাশোল মাছের নাম শোনা যেত, এখন আর তেমন দেখা যায় না।
ঋতু বদলে নদীর রূপ
বর্ষায় সোমেশ্বরী ফুলে ওঠে, পানি বাড়ে, স্রোত বাড়ে। তখন নদীটা দেখতে ভরাট আর শক্তিশালী লাগে। শীতের দিকে পানি কমে গিয়ে বেরিয়ে আসে চওড়া সোনালি বালুচর। রোদ পড়লে বালুর ওপর সোনালি আভা ছড়ায়, এজন্যই অনেকে একে সোনালি নদী বলে। শীতকালে নদীর পাড় ধরে হাঁটা সহজ, বালুচরে বসে সময় কাটানো যায়, ছবি তোলার জন্য এই সময়টাই ভালো। ভ্রমণের সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। বর্ষায় ভরা নদী দেখতে চাইলে জুন থেকে সেপ্টেম্বরে যাওয়া যায়, তবে স্রোতের কথা মাথায় রাখতে হয়।
নৌকায় নদী পারাপার
দুর্গাপুর থেকে বিরিশিরি আর বিজয়পুরের বেশিরভাগ জায়গা নদীর ওপারে। বিরিশিরি ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ে, নদী পার হয়ে ওপারে গিয়ে অটো বা মোটরসাইকেল ভাড়া নিলে চীনামাটির পাহাড়, বিজয়পুর সীমান্ত আর রানীখং গির্জা ঘোরা যায়। নৌকার ভাড়া জনপ্রতি অল্প, ঘাটে গেলেই জানা যায়। নদীতে ঘোরার জন্য নৌকা ভাড়া করে কিছুক্ষণ বেড়ানোও যায়, মাঝির সঙ্গে আগে থেকে সময় আর ভাড়া ঠিক করে নিলে ভালো। বিরিশিরি সেতু থেকে নদীর দুই দিকের দৃশ্য দেখা যায়, বিকেলের দিকে সেতুর ওপর থেকে নদী আর পাহাড়ের ছবি সুন্দর আসে।
নদীর পাড়ে কী দেখবেন
নদীর পাড় ধরে হাঁটলে একদিকে বালুচর আর স্বচ্ছ পানি, আরেকদিকে সবুজ গাছপালা। নদীর ওপার থেকে চীনামাটির পাহাড়ের টিলা দেখা যায়। সকালের দিকে নদীর পাড়ে স্থানীয় জেলেদের মাছ ধরা আর বালু তোলার কাজ চোখে পড়ে। নদীর কাছেই বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি, যেখানে গারো আর হাজং জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা যায়। একটু এগিয়ে গেলে কমলা রাণীর দিঘী। নদীর ওপারে বিজয়পুর সীমান্ত, শীতের মৌসুমে পাশের টিলায় কমলার বাগানে গাছে কমলা ধরে।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দুর্গাপুরগামী সরাসরি বাস ছাড়ে। ভাড়া বাসভেদে 300 থেকে 550 টাকার মতো, ভাড়া বদলায় বলে কাউন্টারে জেনে নেওয়া ভালো। রাতের বাসে উঠলে ভোরে দুর্গাপুর পৌঁছানো যায়। ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় 170 থেকে 180 কিলোমিটার, যেতে 6 থেকে 7 ঘণ্টা লাগে। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর থেকে হাওর এক্সপ্রেস বা মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে শ্যামগঞ্জ নেমে সেখান থেকে বাস বা সিএনজিতে দুর্গাপুর যাওয়া যায়। ময়মনসিংহ থেকে দুর্গাপুরের বাসে 1 থেকে 2 ঘণ্টা লাগে। দুর্গাপুর থেকে বিরিশিরি ঘাট কাছেই, হেঁটে বা রিকশায় যাওয়া যায়।
খরচ আর থাকার হিসাব
ঢাকা থেকে একদিনের ট্রিপে যাতায়াত, খাওয়া আর ঘোরাঘুরি মিলিয়ে জনপ্রতি 1200 থেকে 1800 টাকার মতো লাগতে পারে, দল বেঁধে গেলে জনপ্রতি খরচ কমে। নদীর ওপারে ঘোরার জন্য সারাদিনের অটো ভাড়া 500 থেকে 600 টাকার মধ্যে পড়ে, ভাড়া আগে থেকে ঠিক করে নেওয়া ভালো। দুদিন থাকতে চাইলে দুর্গাপুর শহরে সাধারণ মানের থাকার ব্যবস্থা আছে, আগেই ঠিক করে রাখা ভালো। বিরিশিরি ঘোরার পুরো পরিকল্পনার জন্য আমাদের বিরিশিরি ভ্রমণ গাইড আর বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড়ের লেখাটা দেখে নিতে পারেন।
যাওয়ার আগে যা মনে রাখবেন
বর্ষায় নদীতে স্রোত বাড়ে, গভীর পানিতে নামা ঠিক নয়। নৌকায় ওঠার সময় মাঝির কথা শুনে চলা ভালো। নদীর কিছু অংশে বালু তোলার কাজ চলে, সেসব জায়গা এড়িয়ে চলা ভালো। শীতকালে বালুচরে হাঁটার সময় খাওয়ার পানি আর ছাতা সঙ্গে রাখা ভালো, রোদে বালুচর গরম হয়ে ওঠে। সীমান্ত এলাকা বলে বিজয়পুরের দিকে গেলে নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়।



