📅 রবিবার, 8 নভেম্বর, 2026 ময়মনসিংহের তথ্যকোষ
দর্শনীয় স্থান

গৌরীপুর জমিদার বাড়ি: ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক রাজবাড়ির ইতিহাস ও যাওয়ার গাইড

ময়মনসিংহ শহর থেকে পূর্ব দিকে মাত্র 20 কিলোমিটার গেলেই গৌরীপুর। এই ছোট শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে গৌরীপুর জমিদার বাড়ি, আঠারো শতকের এক রাজবাড়ি। আজ এর ভবনগুলোতে কলেজ চলে, চত্বরে ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনা, তবু পুরনো দেয়াল, কাঠের কারুকাজ আর বাগানবাড়ির পুকুর দেখলে জমিদার আমলের সেই জাঁকজমকের আন্দাজ পাওয়া যায়। ময়মনসিংহ শহর থেকে এক বেলার ঘোরার জন্য জায়গাটা একেবারে ঠিকঠাক।

ইতিহাস

আঠারো শতকের দিকে জমিদার যুগল কিশোর রায় চৌধুরী নিজেদের বসতবাড়ি হিসেবে এই বাড়ি নির্মাণ করেন। পরে তাঁর বংশধর ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর আমলে রাজবাড়ি নান্দনিক রূপ পায়। গৌরীপুরের জমিদারি তখন ছোট ছিল না, ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব পাড় থেকে নেত্রকোণা, বারহাট্টা, মোহনগঞ্জ হয়ে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই জমিদারি। দূরদূরান্ত থেকে খাজনা দিতে মানুষ আসত রাজবাড়ির কাচারিতে।

গৌরীপুরে আসলে পাশাপাশি দুই জমিদারের দুটি বাড়ি ছিল। স্থানীয়রা একটিকে আনন্দ কিশোরের বাড়ি, অন্যটিকে সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহড়ীর বাড়ি বলে চেনে। আনন্দ কিশোরের বাড়িটি এখন গৌরীপুর মহিলা কলেজ, আর সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহড়ীর বাড়িটি গৌরীপুর সরকারি কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

রাজবাড়ির ভেতরে যা আছে

রাজবাড়ির মূল ভবনটি দ্বিতল অট্টালিকা, উত্তর দক্ষিণে 115 ফুট লম্বা আর পূর্ব পশ্চিমে 70 ফুট চওড়া, উচ্চতা 32 ফুট। ভবনের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে 10টি করে মোট 20টি দরজা, পূর্ব ও পশ্চিম দিকে 6টি করে আরও 12টি চওড়া দরজা। দরজাগুলো 11 ফুট উঁচু, 4 ফুট 8 ইঞ্চি চওড়া। পুরো দেয়াল 2 ফুট 2 ইঞ্চি পুরু। অবাক করার মতো বিষয়, ভবনটিতে জানলা নেই বললেই চলে, তবু ভেতরে আলো থাকে আর গরমের দিনেও ঘর ঠান্ডা থাকে।

ষাট ডিগ্রি কোণাকৃতি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলে রানিঘর। কাঠের বিমের ওপর পাটাতনের ছাদ, কাঠের ওপর বাহারি নকশা, দোতলার বারান্দা 17 ফুট চওড়া। রানি থাকতেন এই কাঠের ঘরে, তাই ভবনটির নাম হয়ে যায় রানি ভবন। অন্দরমহলের সামনে ছোট উঠান, তার তিন পাশে 22 দরজার ইটের ভবনে থাকত রাজবাড়ির কর্মচারীরা। অন্দরমহলের উত্তর পাশে রানির গোসলের জন্য খনন করা পুকুরটি আজও রানি পুকুর নামে পরিচিত।

মূল ভবন থেকে একটু দূরে 80 ফুট লম্বা আর 39 ফুট চওড়া কাচারি ভবন, ছাদে কারুকাজ করা গম্বুজ। কাচারি ভবনের একাংশে এখন গৌরীপুর প্রেস ক্লাব, আরেক অংশে মহিলা কলেজের ক্লাস হয়। বিশেষ অতিথিদের জন্য বানানো একতলা ইউরোপিয়ান গেস্টহাউজটি সংস্কারের অভাবে এখন ভগ্নদশায়, ছাদ ধসে পড়েছে। পাশেই আছে নাটমন্দির আর লোহার ঘর নামে পরিচিত দুর্গামন্দির।

ভবনের সামনের বাগানবাড়িতে একসময় বহু প্রজাতির গাছ ছিল। গোল পুকুর আর দ্বীপ পুকুর আজও আছে, দ্বীপের বুকে শতবর্ষী তূর্য তরী নামের বিরল গাছটি নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। বাগানবাড়ির পশ্চিম পাশে জমিদার আমলের মালির ঘরটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে। দেশভাগের পর বাগানবাড়ির জায়গায় উপজেলা পরিষদ বসে, পরে সেখানে নানা সরকারি দপ্তরের ভবন ওঠে।

ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী

গৌরীপুরের জমিদারদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী (1874-1957), এই রাজবাড়ির পঞ্চম জমিদার। তিনি শুধু জমিদার ছিলেন না, শিক্ষা আর সংগীতের বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তৎকালীন সময়ে শিক্ষা খাতে তিনি প্রায় 45 লাখ টাকা দান করেন, সারা পূর্ব বাংলায় শিক্ষায় এত বড় অনুদান তখন আর কেউ দেননি বলে জানা যায়। তাঁর বাবার নামে 1911 সালে গৌরীপুর রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। রাজবাড়ির চারপাশে প্রায় 50 একর জায়গাজুড়ে গড়েছিলেন বোটানিক্যাল গার্ডেন। ধ্রুপদী সংগীতের আসর বসত তাঁর বাড়িতে, দেশের নামকরা সংগীতশিল্পীরা আসতেন গান শোনাতে।

এখনকার অবস্থা

জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর রাজবাড়ির জৌলুস কমে যায়। দেড় দুইশো বছরের পুরনো ভবন কিছুটা সৌন্দর্য হারালেও অলংকরণ এখনো নজরকাড়ে। মূল ভবনের নিচতলায় এখন কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও প্রশাসনিক কক্ষ, আর ছোট বড় আটটি রুমে প্রয়োজন হলে ক্লাস ও পরীক্ষা হয়। ভবনগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ভেতরের ক্লাসরুমে ঢোকা যায় না, তবে চত্বর, বাগানবাড়ি আর পুকুরপাড় ঘুরে দেখা যায়।

বিজ্ঞাপন

কীভাবে যাবেন

ময়মনসিংহ শহর থেকে গৌরীপুরের দূরত্ব প্রায় 20 কিলোমিটার। শহর থেকে বাসে বা সিএনজিতে যাওয়া যায়, রাজবাড়ি গৌরীপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে। ঢাকা থেকে গৌরীপুরের দূরত্ব প্রায় 140 কিলোমিটার, বাসে সরাসরি আসা যায়, অথবা ময়মনসিংহ হয়ে যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে ময়মনসিংহ জংশন থেকে গৌরীপুর জংশন পর্যন্ত ট্রেন আছে, স্টেশন থেকে রিকশায় রাজবাড়ি পৌঁছানো যায়। রাজবাড়ি ঘুরতে কোনো টিকিট লাগে না। ঘোরার সেরা সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, শীতের নরম রোদে পুরনো ভবনের ছবি ভালো আসে। সকালে গেলে ভিড় কম থাকে।

গৌরীপুর লজের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না

একই নামে ময়মনসিংহ শহরেও একটি স্থাপনা আছে, ব্রহ্মপুত্র পাড়ের ঈশান চক্রবর্তী রোডে কাঠ আর টিনের তৈরি গৌরীপুর লজ। সেটা আলাদা বাড়ি, আলাদা জায়গা। এই লেখাটা গৌরীপুর উপজেলা শহরের জমিদার বাড়ি নিয়ে, যেখানে এখন মহিলা কলেজ আর সরকারি কলেজ চলে।

একই দিনে আশপাশে

গৌরীপুর শহর থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি, সেখানেও এক বেলায় ঘুরে আসা যায়। সকালে ময়মনসিংহ শহর থেকে রওনা দিয়ে দুপুরের মধ্যে গৌরীপুর রাজবাড়ি আর রামগোপালপুর দেখে বিকেলে শহরে ফেরা যায়।

W

লেখক

Walid Forhad

Mymensingh Info-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এডিটর।